মীরার জীবনের সুন্দর সময়গুলো ব্যর্থ হয়ে গেছে পাষন্ড স্বামীর জন্য- অন্য সবার সাথে কিন্তু আবিদের আচরণ- ব্যবহার একদম স্বাভাবিক, অতি মধুর, ভদ্র এবং সংযত- বিশেষ করে মেয়েদের কাছে তার ইমেজ লেডি কিলারের, আর্কষণীয় ব্যবহার ও কথা দিয়ে মেয়েদের মন জয় করায় সে ভারী ওস্তাদ, একজন অভিজ্ঞ লম্পটের পক্ষে যা অত্যন্ত স্বাভাবিক- একমাত্র মীরাই জানে যে স্বামী নামে এই ভয়াবহ মানুষটা মুখোশ পরা ভদ্রবেশী শয়তান।
মাঝে মাঝে ভেবেছে মীরা- স্ত্রীর মর্যাদাই যদি না দেবে, ভালোই যদি না বাসবে, নিরীহ- নির্দোষ স্ত্রীর সাথে অমানবিক আচরণই যদি করবে- তবে বিয়ে করলো কেন?
তার টাকার জোর আছে- অনায়াসে যে কোনো মুল্যে কিছু নারীদের ভোগ করা তার জন্য কোনো ব্যপারই ছিলো না।
আবিদকে এসব প্রশ্ন করার সাহস হয়নি- নিজেই জবাব খুঁজে নিতে চেষ্টা করেছে।
তার স্বামী বিকৃত রুচির মানসিক প্রতিবন্ধী- যেহেতু আবিদের আপনজন কেউ ছিলো না- তাই তার সংসার দেখার জন্য, তার যত উদ্ভট এবং আজব খেয়াল পূরণ করতে নিরীহ, শান্ত একটি মেয়ের দরকার ছিলো- মীরাকে এক নজর দেখেই তার অভিজ্ঞ চোখ বুঝেছিলো- একেই প্রয়োজন, তাই মীরাকে বিয়ে করেছে।
ভালোবাসার প্রকৃত অর্থ সে জানে না- অন্য নারী তার নীচ প্রবৃত্তির কামনা- বাসনা চরিতার্থ করার সহায়ক কিন্তু মানসিক ও শারীরিক অত্যাচার সইতে পারবে ঘরের বউ- তাই আবিদের বিয়ে করা।
এই কুরুচিপূর্ণ ব্যাখ্যা নিজের কাছেই নোংরা, অশ্লীল মনে হয়েছে কিন্তু স্বামীর সৃষ্টি ছাড়া দুর্ব্যবহারে এছাড়া অন্য কিছু ভাবতে পারেনি। মাতাল স্বামীর হাতে নির্যাতন, অকথ্য গালাগাল- এই ছিলো মীরার বিবাহিত জীবনের নিত্যসঙ্গী। মীরার কোনো কাকুতি মিনতিতেই আবিদ তার পথ থেকে ফেরেনি- কান দেয়নি স্ত্রীর আকুলতাকে- চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনী। নিজেকে সংশোধন করার দরকারও মনে করেনি- নারী শ্রেফ তার কাছে ভোগের সামগ্রী।
রিনির ডাকে সম্বিত ফিরে পায় মীরা- চমকে তাকিয়ে দেখে ভাতের ফ্যান উথলে উঠে চুলো নিভে গেছে কখন, সে টের পায়নি। একরাশ ক্ষোভ রিনির কন্ঠে…
– তোমাকে নিয়ে কি করি বলতো মা? সব সময় বিশ্রী অতীতের আর্বতে ঘুরপাকখেতে থাকো- তোমাকে না বলেছি, নেগেটিভ চিন্তাধারা তোমার সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে, ভালো কিছু সেই দেয়াল ভেদ করে তোমার কাছে আসতে পারবে না- আরো কিছু বলতে যাবে রিনি- মীরা চুলো ধরিয়ে ভাতটা ঠিক করে বসিয়ে বাঁধা দিয়ে হাসিমুখে বললো- আচ্ছা! পড়া ফেলে মায়ের ওপর নজরদারি করা হচ্ছে, না?
বিব্রত হাসে রিনি- না, মা তা নয়, পড়তে পড়তে এমন ঝিমুনি এলো, ভাবলাম চা বা কফি খাই, সমস্ত আলসেমি কেটে যাবে, সেটাই বলতে এসেছিলাম, দেখি মা আমার স্মৃতিচারণে মগ্ন- তা চোখে পানি নেই কেন? না কাঁদলে তোমার স্মৃতি রোমন্থন করা যে ব্যর্থ!
-ফাজিল মেয়ে, মায়ের সাথে মশকরা? তুই ঘরে যা, আমি ভাতটা ঠিকা দিয়েই চা নিয়ে আসছি।
-না মা, চা নয়, কড়া করে চিনি দুধ ছাড়া কফি খাবো, নইলে ঘুম ঘুম ভাব কাটবে না।
-ঠিক সেই স্কুলে পড়া বাচ্চা মেয়ে, পড়তে বসলেই ঘুম পায়।
লজ্জিত হাসি হাসে রিনি, তারপর আবদারের সুরে বলে- মা, তুমিও কিন্তু আমার সাথে কফি খাবে, তুমি দুধ চিনি মিশিয়ে নিও, নইলে খেতে পারবে না।
-নারে আমি এখন ও খাবো না, রাতে ঘুম হবে না
-মা, রাতে চা কফি খেলে ঘুম আসবে না, না খেলে মাথা ব্যথা করবে- ওসব সমস্যা আমার নেই, লক্ষ্মী মা আজকে খাও, তাছাড়া একা একা খেতে আমার ভালো লাগবে না-
মুহূর্তে মীরার অনেক আগের কথা আবার মনে পড়ে যায়, তখন সদ্য বিয়ে হয়েছে মীরার- তখনও আবিদের স্বরূপ প্রকাশ পায়নি, স্ত্রীকে ভালোবাসায় ভরিয়ে রাখতো।
অফিসের পরে সোজা বাসায় চলে আসতো- কখনো শপিং, কখনো শুধুই গাড়িতে করে ঘুরে বেড়ানো, কখনো বা রাতে ডিনার সেরে ফিরতো।
সময় মত যেদিন আবিদ ফিরতে না পারতো, মীরা রাতের খাবার নিয়ে স্বামীর অপেক্ষায় বসে থাকতো- কতদিন অনুযোগ করেছে আবিদ-
-কেন আমার জন্য না খেয়ে বসে থাকো? নানা কাজে ব্যস্ত থাকি, দেরী হয়ে যায়।
করুণ সুরে মীরা বলেছে- একা একা খেতে ভালো লাগে নাগো।
সস্নেহে মীরার কপালে চুমু দিয়ে আবিদ বলতো-
-কাপড় বদলে এখনি আসছি।
সেসব মধুর দিনগুলো আস্তে আস্তে হারিয়ে যেতে লাগলো- আবিদ বাইরের রঙিন পঙ্কিল জগতে ডুবে মীরার কাছে থেকে অনেক দুরে চলে গেলো।
তখনো খাবার নিয়ে বসে থাকতো মীরা- মদে চুর হয়ে ফিরতো আবিদ- মরা মাছের মত ঘোলাটে চোখের দৃষ্টি, তেলতেলে চেহারা, মুখে দুর্গন্ধ- সুদর্শন ভদ্র আবিদকে রাতে চেনা দায়। বুক ফেটে কান্না আসতো মীরার।
মীরাকে খাবার নিয়ে বসে থাকতে দেখে উপহাসের হাসি হেসে বলতো আবিদ- সতী নারীর পতি প্রেম তাই না? এইসব ন্যাকামী আমার বরদাস্ত হয় না-
বিড়বিড় করে বকতে বকতে ঘরে চলে যেতো।
মীরা জানে বলে লাভ নেই তবু অশ্রু চেপে ঘরে এসে বলতো- খেতে এসো।
জড়ানো স্বরে উত্তর আসতো- শরীরটা আজকে খুব ব্যথা করছে, জলদি এসে টিপে দে।
কতদিন রাতে না খেয়ে থেকেছে মীরা, পরে বাচ্চা পেটে আসতে জোর করে কিছু খেয়েছে, একেবারে না খেয়ে থাকলে সন্তানের ক্ষতি হবে।
-মা মা আবার হারিয়ে গেছো? যাও কিছু খাবো না আমি, ঐ মানুষটাকে যদি ভুলতে না পারো, আমাকে ভুলে যাও।
আকুল হয়ে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে মীরা-
-ওরে না না এই কথা কখনো মুখে আনবি না, তুই যে আমার অন্ধের যষ্ঠি- আমার স্বপ্ন, আমার আনন্দ- তুই ছাড়া আমার দুনিয়া আঁধার।
মাকে কাঁদতে দেবে না রিনি তাই দুষ্টুমির সুরে বলে- এত ভালোবাসা, তোমার পতিদেবতা এই অমূল্য রত্নকে চিনলো না।
এমন মুখ ভঙ্গিমা করে বললো রিনি যে- সব ভুলে, চোখে পানি নিয়ে হেসে ফেললো মীরা।
মেয়ে হওয়ায় দারুণ অসন্তষ্ট হয়েছে আবিদ। স্বাভাবিক প্রসব হওয়ায় দুদিন পরেই মীরা বাড়ি চলে এলো। আবিদের কাছে মীরার জন্য কোনো মায়া দয়া নেই ঠিকই কিন্তু ডেলিভারীর সব খরচ তো মিটালোই উপরন্তু- নার্স, আয়াদের মোটা বখশিশ দিলো- বাইরের মানুষের কাছে সে তো অতি ভদ্র ও বিনয়ী- মেয়ে হয়েছে শুনে নার্সদের সামনেই যে কটুক্তি মুখ ফসকে করে ফেলেছিলো, সেটা টাকার বিনিময়ে ধামাচাপা দিলো।
বাচ্চাকে নিয়ে কোনো আগ্রহ নেই- মুখ দেখলো না, কোলে নিলো না- নির্বিকার- কিন্তু আশ্চর্য বাচ্চার যা যা জিনিসের দরকার, সবই সে কিনে অফিসের পিয়ন রাজুকে দিয়ে পাঠিয়ে দিলো, ছেলেটা আগেও এটা সেটা জিনিস বাসায় পৌঁছে দিয়েছে, মীরা রাজুকে খুব স্নেহ করতো, এলেই যত্ন করে খাওয়াতো, রাজুও মীরাকে সম্মান করতো।
বাচ্চার জিনিসগুলো মীরার হাতে দিয়ে মাথা নীচু করে রাজু বললো- ম্যাডাম, সাহেব বলেছেন আরো কিছুর দরকার হলে জানাতে।
আবিদের ব্যাপারে মীরা এখন আর অবাক হয় না, নিজের সন্তানের ওপর যার টান মায়া নেই, তার ওপর কি ভরসা!
তথাপি নরম সুরে বললো- ঠিক আছে।
তারপর ছেলেটাকে চা মিষ্টি খাইয়ে বিদায় করলো।
দিনের পর দিন কাটতে লাগলো- এক ঘরে শোওয়া আবিদ অনেক আগেই বাদ দিয়েছিলো, রিনিকে নিয়ে মীরা একাই অন্য ঘরে শুতো, মেয়ের নামও মীরাই রেখেছিলো।
শিশুকাল থেকেই রিনি খুব শান্ত- লক্ষ্মী, কান্নাকাটি কমই করতো, মাকে একদম জ্বালাতো না, নইলে ঘর সংসারের কাজ দেখে, একা হাতে বাচ্চা সামলাতে পারতো না।
মীরার নিজের কোনো চাহিদা ছিলো না, প্রথম প্রথম যা কিছু কিনেছে- এরপর ভাঙা মন নিয়ে সাজগোজও করতো না, কোথাও যেতোও না, যেহেতু আবিদ দিন রাতের বেশীটা সময় বাইরে থাকতো তাই মীরা চুপচাপ বেরিয়ে ব্যাঙ্কের দরকারি কাজ সেরে নিতো- কোনো কিছু কিনতো না, ডিপোজিটের সুদের টাকা তো থাকতোই কিন্তু আবিদ ওকে আলাদা করে হাত খরচ দিতো না, যাতে স্বামীর সন্দেহ না হয় সেজন্য দরকার হলেও কিছু কিনতে পারতো না-
আবিদ অবশ্য রাতে নেশার ঘোরে প্রায়ই বলতো-
-আমি তোদের মা মেয়েকে বসিয়ে খাওয়াতে পারবো না, আমি জানি তোর কাছে টাকা আছে, মানুষ চরিয়ে খাই আমি, আমাকে বেকুব ভেবেছিস? তোর বাপের টাকা কি করেছিস বল হারাম*জাদী-
একটাও প্রতিবাদ করেনি, যেটা সহজে পারতো সেটাই করেছে- নীরবে চোখের পানি ফেলেছে আর মনে মনে আল্লাহ্কে বলেছে-
-আমাকে ধৈর্য্য ধরার সহ্য করার শক্তি দাও তুমি।
নিজেকে সব রকম ভাবে বঞ্চিত করে, আত্মত্যাগ করে দিন কাটিয়েছে- জীবনের ভুল শুধরে একা নিঃসঙ্গ থাকা অনেক ভালো, কিন্তু বাচ্চাটার জন্য পারেনি- ভুলগুলোর জের টেনে আগুনের তাপে জ্বলেছে- সাহস করে কোনো পদক্ষেপ নিতে ভয় পেয়েছে।
বাচ্চাটা কখনো বাবার স্নেহ আদর পায়নি, মেয়েকে বকেছে, মেরেছেও- একটু একটু করে বড় হয়েছে রিনি, অবোধ নিষ্পাপ শিশু দুচোখ মেলে কেবল দেখেছে বাবার রুদ্র মূর্তি, তাদের প্রতি লোকটার জঘন্য আচরণে শিশু মনে গেঁথে গেছে প্রবল ভীতি তারপর সময়ের সাথে সাথে সেই ভীতি- ঘৃণা ও বিতৃষ্ণায় পরিণত হয়েছে।
মানুষটাকে বাপ হিসাবে মানতে কষ্ট হয়েছে- মা যে কেমন করে দীর্ঘদিন ধরে এতটা সহ্য করেছে, ভেবে আশ্চর্য হয়েছে।
রিনির এক বছরের জন্মদিনে আবিদ বিশাল এক পার্টির আয়োজন করলো সোনারগাঁ হোটেলে- মীরাকে কিছু বলতে হয়নি, সে বরং চিন্তা করছিলো কি করবে- যে মানুষ নিজের সন্তানকে অপছন্দ করে তাকে আবার জন্মদিনের কথা কিভাবে বলে।
মীরাকে আশ্চর্য করে দিয়ে জন্মদিনের দুই দিন আগে আবিদ বিকালের দিকে হঠাৎ বাসায় এসে উপস্থিত, একটু উদ্বিগ্ন হলো মীরা, এসময় তো বাসায় ফেরার কথা নয় সংসার বিমুখ মানুষটির, আবার কোন হাঙ্গামা শুরু করে, নেশা করলে তো মাথার ঠিক থাকে না- না নেশা করেনি, সম্পূর্ণ স্বাভাবিক।
আরো চমক অপেক্ষা করছিলো মীরার জন্য, হাতে কতগুলো প্যাকেট নিয়ে ঘরে এসে বিছানায় ফেলে দিয়ে নিরাসক্ত গলায় বললো-
-রিনির জন্মদিনে হোটেলে পার্টি দিচ্ছি, সম্মানিত সব মেহমানরা আসবেন, কিছু জিনিস এনেছি তুই আর তোর মেয়ের জন্য- ফাইভ ষ্টার হোটেল, পেত্নীর মত যাবি না, ভালো করে সেজে যাবি, দেখিস, আমার প্রেষ্টিজ ফুঁটো করে দিস না।
কতক্ষণ পরে আবার বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলো আবিদ।
মেয়েকে খেলনা দিয়ে বসিয়ে রেখে কৌতূহলে প্যাকেটগুলো খুলে দেখলো এবং চমকে গেলো মীরা।
সুদৃশ্য প্যাকেট খুলতেই মীরা চমকে উঠে দেখলো- রিনির চমৎকার দামী ফ্রক, জুতো, এমনকি চুলের সুন্দর ক্লিপ- ব্যন্ড, ফিতা ইত্যাদি তো রয়েছেই, মীরার জন্য দামী জামদানী, প্রসাধনী- এগুলো তো মামুলী ব্যাপার, যেটা ওকে সবচেয়ে অবাক করলো- সেটা হলো আবিদের এহেন উদারতা- কেন! রিনির নাম লেখা সোনার লকেট, মোটা চেনের সাথে লাগানো, ছোট্ট এক জোড়া বালা- এইই সব নয়- মীরার জন্যও রয়েছে সোনার এক সেট গয়না।
আবেগে মীরার চোখে পানি চলে এলো- এই অশ্রু বেদনার নয়, আনন্দের- কাপড় গয়না বড় কথা নয়- স্বামীর সহানুভূতি, ভালোবাসা, স্ত্রী- সন্তানের প্রতি দায়িত্ব, কর্তব্য পালন সব নারীরই আকাঙ্খা, প্রত্যাশা থাকে, এর ব্যতিক্রম জীবনে বিপর্যয় অবধারিত- এখন কথা হলো- আবিদ কি শুধরে গেলো!
কোন জাদুতে মানুষটা বদলে গেলো? এই জিনিস কেনা ওর বতর্মান চরিত্রের সাথে একদমই মেলে না সব কিছু আবার ভালো করে দেখতে দেখতে অন্যমনস্ক হয়ে ভাবলো মীরা- রাতে যখন আবিদ ফিরবে, তখনই বোঝা যাবে, অদৃশ্য জাদু লোকটাকে সত্যিই বদলে দিলো কিনা।
যথারীতি মীরাকে হতাশ করে আবিদ রাতে ফিরলো টলতে টলতে, খাবে কিনা জিজ্ঞেস করতে বাজে একটা গালি দিয়ে বললো- জানিসই তো খাবো না, রাত দুপুরে এই নাটক করিস কেন? যা দুর হয়ে যা আমার সামনে থেকে-
সেই কবে থেকে মীরাকে তুই তোকারি, নিকৃষ্ট ভাষায় ধমক, গালি- আবিদ বলা শুরু করেছে, যেন ওর কেনা বাঁদী- স্বামীর বদলে যাওয়ার স্বপ্ন ভঙ্গের হতাশা বুকে চেপে রিনিকে নিজের বুকের সাথে আঁকড়ে ধরে বলে মীরা- তুইই তো আছিস মা আমার, লক্ষ্মী সোনা মেয়ে আমার, সাত রাজার ধন, আর আমার কিছু চাই না, কাউকে চাই না।
পার্টির দিন সকালে আবিদ আবারো মীরাকে চমকে দিলো, রিনিকে কোলে নিয়ে চুপচাপ বসে ছিলো, আবিদ নাস্তা সেরে তৈরী হচ্ছে অফিসে যাবার জন্য, খানিক পরে আফটার শেভ লোশনের সুগন্ধে সচকিত হয়ে মীরা চাইলো, আবিদ ঘরে এসে দাঁড়িয়েছে- মুখটা হাড়ির মত, গম্ভীর হয়ে হাতে ধরা এক গোছা নোট মীরার গায়ে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বললো,
-আমি বিকেলে গাড়ি পাঠিয়ে দেবো, টাকা দিলাম, পার্লার থেকে সেজে যাবি পার্টিতে, ভাবিস না যে, এত কিছু করছি তোদের ভালোবেসে, মায়া করে- যেসব মানুষকে দাওয়াত করেছি, তাদের কাছে তোরা বিজনেসম্যান আবিদ চৌধুরীর স্ত্রী ও মেয়ে সুতরাং সাজ পোশাকে কোনো ত্রুটি আমি সহ্য করবো না, তাহলে কিন্তু বাসায় ফিরে তোদের একটাকেও আস্ত রাখবো না, মনে রাখিস।
খুব আশা ও ভরসার আশ্বাসই বটে- ঘৃণায় অন্তর ভরে গেলো মীরার, দুঃসহ বেদনা বুকে চেপে পার্টিতে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতে লাগলো মীরা।
হোটেলের বিশাল পার্টি রুমে ঢুকে হকচকিয়ে গেলো মীরা- জমকালো ভাবে সাজানো হলরুম ঝকমক করছে। মেয়ের হাত ধরে দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে রইলো। নানা বয়সী, নানা সাজের নারী পুরুষের ভীড়ে আবিদকে খুঁজতে লাগলো তার ভীত চোখ দুটো।
কোথা থেকে দ্রুত হাসিমুখে এগিয়ে এসে আবিদ রিনিকে কোলে তুলে নিয়ে মীরার হাত ধরে ভিতরে যেতে যেতে আহ্লাদী গলায় বলতে লাগলো-
-ডার্লিং, দেরী করে ফেললে, সবাই তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছে, চলো চলো।
অনেক প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে মীরাকে দিন কাটাতে হয়েছে, সয়েও গেছে সব কিছু কিন্তু আবিদের কোলে এই প্রথম রিনিকে দেখে মীরা আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলো নিজেকে সামলাতে।
আরো বিচলিত হলো স্বামীর চোখে তার প্রতি মুগ্ধ দৃষ্টি ফুঁটে উঠতে দেখে- বুকের মধ্যে কেমন করে উঠলো, কতদিন স্বামীসঙ্গ থেকে বঞ্চিত মীরার অন্তর হাহাকার করে উঠলো।
আবিদ যেন আজ নতুন করে আবিস্কার করলো স্ত্রীকে, অপ্সরীর মত লাগছে মীরাকে- আর বাচ্চা রিনি যেন রূপকথার রাজকন্যা- খুব যত্ন করে ওকেও সাজিয়েছে মীরা।
গর্বিত আবিদ ডলপুতুলের মত মেয়েকে ও উর্বশী স্ত্রীকে নিয়ে অতিথিদের মধ্যে ঘুরতে লাগলো। মীরাকে আবিদের বন্ধুরা সবাই চেনে না কারণ সে তার বন্ধু মহলে মীরাকে নিয়ে আসতো না আর রিনিকে তো কেউ দেখেইনি সুতরাং পুরুষদের চোখে মুগ্ধ প্রশংসনীয় দৃষ্টি ও নারীদের দৃষ্টিতে ঈর্ষা ফুঁটে উঠলো, সবার সাথেই মীরা সহজ ভাবেই কুশল বিনিময় করতে লাগলো, আবিদ যেমন পাকা অভিনেতার মত স্ত্রী- মেয়েকে নিয়ে আদিখ্েযতা করতে লাগলো, মীরাই বা কম কিসে- সেও হাসিমুখেই সবার সাথে মিশতে লাগলো।
একটা বড় টেবিল জন্মদিনের উপহারে ভরে প্রায় উপচে পড়ছে, কেকটাও দেখার মত, রিনিকে সবাই কোলে নিয়ে নিয়ে আদর করছে- আবিদকে সুবেশা মহিলারা ঘিরে ধরে আধো আধো ন্যাকামীর স্বরে বলছে- আবিদ তুমি তো দেখছি ছুপা রুস্তুম, সুন্দরী স্ত্রী, পুতুলের মত মেয়েকে লুকিয়ে রেখেছিলে- জন্মদিনের পার্টি দিতে তোমাকে না ধরলেতো জানতেই পারতামনা যে এমন পরীর মত স্ত্রী তোমার।
-বুঝলাম অনেক সেয়ানা মাল তুমি, গাছেরও খাও আবার তলারও কুড়াও-
সমবেত হাসির কলরোলে আবিদ লজ্জিত মুখে-
-কি যে বলো না- আচ্ছা তোমরা এনজয় করো আমি একটু ওদিকে দেখি- বলেই সরে পড়লো।
মীরার কানে সব কথাই এলো, শুনলো কিন্তু কোনো প্রতিক্রিয়া হলো না তার, সেতো জানেই, স্বামী তার কি জিনিস মক্ষীরানীদের সাথে ওর কথা বলার ঢং দেখেই পরিস্কার বোঝা গেছে।
মীরার সাথেও কয়েকজন মহিলা বসেছিলো- .
একজন বললো,
-ভাই তুমি এত সুন্দরী, জানতাম না, আবিদ তোমার মত রত্ন রেখে বাইরে কেন যায়!
– আহা, আবিদের মত মৌমাছি কি আর এক ফুলের মধু খেয়ে সন্তুষ্ট থাকার মানুষ ?
-তুমি যে খুব ভালো মানুষ, বুঝতেই পারছি, আমার স্বামী হোতো- বাছাধনের নাকের পানি চোখের পানি এক করে ছাড়তাম।
-আরে, তুমি খালি হাতে বসে আছো কেন? অনেক রকম আছে, কোন পানীয় পছন্দ করো তুমি?
এতক্ষণে মুখে ভাষা ফিরে পায় মীরা, এদের মাঝে বসে থাকতে ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছে, উঠেও যেতে পারছে না, আবার প্রশ্ন শুনে সচকিত হলো-
-বললে না ভাই, কি নেবে?
ওদের হাতের গ্লাসের রঙিন পানীয় দেখে ভেবেছিলো কোক খাচ্ছে বুঝি, বিব্রত বোধ করে মীরা, বুঝলো গ্লাসে কি, নীচু স্বরে বললো-
-আমি খাই না।
যেন ভিনগ্রহের ভাষা শুনছে, এমন মুখ করে চেয়ে থেকে অর্থপূর্ণ হাসিতে সব ভেঙে পড়লো-
-সেকি গো, আবিদ তো পানির বদলে মদ খায়, তার বউ হয়ে তুমি একেবারে নিরামিষ!
সেদিনের কথা সহজে ভুলতে পারবে না মীরা, ওকে নিয়ে হাসি তামাশা তো হলোই, আবিদকে এইসব মানুষের সাথে মিশে আনন্দ করতে দেখে বুঝে গেলো স্বামীকে আপন করে পাওয়া হয়তো এই জীবনে সম্ভব না।
রাতে বাসায় ফিরে মীরাকে জোর করে নিজের কাছে টেনে এনে যা খুশী তাই করলো আবিদ, এই প্রেমহীন মিলনে মীরার নিজেকে ধর্ষিতা মনে হলো।
এরপর রিনির জন্মদিনের কথা ভুলেও মুখে আনেনি মীরা, যে সমাজে আবিদ চলা ফেরা করে সেখানে মীরা বেমানান। বাসায় চুপচাপ নিজের মত করে মেয়ের সব জন্মদিন পালন করেছে।
স্কুলে ভর্তি হলো রিনি, মীরাই আনা নেওয়া করতো, প্রথম দিকে রিনি আবদার করতো- বাবা ওকে স্কুলে নিয়ে যাবে, আসার সময় চিপস চকলেট কিনে দেবে- রিনির মনের ইচ্ছে পূরণ হয়নি আস্তে আস্তে রিনি বুঝতে শিখলো বাবা নয়, মা ওর সব কিছু এবং ক্রমে বাবার কাছে থেকে দুরে থাকাও শিখলো।
অভিমানি সুরে মেয়েটা একদিন প্রশ্ন করে মাকে-
-মা, আমার বাবা কেন আমার অন্য বন্ধুদের বাবার মত নয়! কেন আমাকে স্কুল থেকে আনে না, আমাকে পুতুল, আইসক্রিম কিনে দেয় না, আদর করে না, কোলেও নেয় না।
মেয়েকে আদর করে শিশু মনের কৌতূহল মেটাতে চেষ্টা করে মীরা।
-তোমার বাবা যে কাজে ব্যস্ত থাকে মা আর আমি তো সব কিনে দেই, তোমার আর কি চাই আমাকে বলো, সোনা বাচ্চাটার জন্য সব করবো আমি।
লক্ষ্মী শান্ত রিনি আর কোনো আবদার করেনি, মীরা মাঝে মাঝে আবিদকে বলেছে – মেয়েটা তো এখনো কিছু বোঝে না, ওকে যদি একটু আদর করো, কোলে নাও, কি অসুবিধা তোমার!
-তোকে কৈফিয়ত দিতে হবে? বাচ্চা আমার ভালো লাগে না, বিয়েটা করে দেখছি ভুলই করেছি, সংসারের বন্ধন আমার জন্য নয়, যেদিকে খুশী চলে গেলেই তো পারিস, আমি বেঁচে যাই।
এটা করতে পারলে মীরাও বেঁচে যায়- কিন্তু বিবাহিত জীবন আল্লাহর দান, নারী পুরুষের পবিত্র বন্ধন, প্রেম ভালোবাসা প্রকৃতির নেয়ামত- এই নেয়ামতকে অস্বীকার করা বা দাম্পত্য জীবনের অন্যায় সুযোগ নেওয়া উচিত নয়- দুজন দুজনের কাছে থেকে সরে যাওয়া কোনো সমাধান নয়, পরস্পরকে ভালোবেসে মধুর সম্পর্ক বজায় রাখা নারী পুরুষ উভয়ের দায়িত্ব, কর্তব্য।
মীরা চলে যাওয়ার কথা ভাবে না, শুধু চায়, স্বামী ওকেই ভালোবাসুক, সন্তানকে মমতা করুক, ছোট্ট একটা সুন্দর সংসার হতে বাঁধা কোথায়?
ভালোবাসার অকৃত্রিম আবেগে হ্নদয় ভরিয়ে দিয়ে স্বর্গীয় আনন্দে ভরে উঠুক জীবন, অভিশাপ নয় আর্শীবাদে পরিপূর্ণ হোক তাদের জীবন- জনম জনম ধরে প্রতীক্ষায় থাকবে আবিদের ফিরে আসার, মীরার এই প্রতীক্ষা কি বিফলে যাবে? স্বামীকে সে ফিরে পাবেই- এই বিশ্বাস নিয়েই দিন কাটায় মীরা ।
জানিনা ফুরায় যদি এই মধু রাতি
আকাশে জাগিয়া থাক তারারও বাতি।
তোমার আমার নব পরিচয়,
এই জীবন হোক ওগো হোক মধুময়।
এত কাছে তবু কেন
দুরে মনে হয় যেন
তোমাকে খুঁজে বেড়ায় এই আখি
আমি ফুল তুমি রাত জাগারও পাখি।
গাইতে গাইতে মীরা কান্নায় ভেঙে পড়ে। মনে পড়ে কত স্মরণীয় সব মুহূর্ত- এই গানটা শুনতে খুব পছন্দ করতো আবিদ, হ্যাঁ মীরা গান গাইতে পারতো- একমাত্র মেয়েকে সবদিক দিয়ে সুশিক্ষিত করে তুলতে বাবা মা কোনো কার্পণ্য করেননি, মীরা ছোট বেলা থেকেই গান খুব পছন্দ করে তাই গানের স্কুলে ভর্তি করা হয়েছিলো। বেশ ভালোই গাইতো মীরা।
বি.এ. পরীক্ষার পরপরই আবিদের সাথে বিয়ে হয়ে যায়- মীরার বাবা জামাইকে বলেছিলেন,
-বাবা, আমার মেয়েটা গান ভালোবাসে, সুন্দর গাইতেও পারে- ও যদি আরো শিখতে চায়, তুমি অনুমতি দিও।
মাথা নেড়ে সায় দেয় আবিদ। বাসর রাতে বরের বায়না- বউয়ের গান শুনবে। ফুলের শয্যায় সুন্দরী সুসজ্জিতা বধূ , পাতলা জরির ওড়নার ঘোমটা দিয়ে মাথা নীচু করে বসে বসে ঘামছিলো, আবিদ এসে ঘোমটা ফেলে রূপসীর মুখটা তুলে ধরে বলে- এত মিষ্টি বউটা আমার, গলার সুর ও নিশ্চয় মধুর মতই হবে।
এই কথা বলেই মীরার কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে পড়ে আবিদ বলে- আব্বা বলেছেন তুমি খুব সুন্দর গান গাইতে পারো, শোনাও।
হায় হায় এই কেমন কথা, আলাপ হলো না, ভালো করে পরিচয়ও নয়- প্রেমের কোনো কথা নয়- সব ছেড়ে বরকে গান শোনাতে হবে!
এমনিতেই লজ্জায় মরে যাচ্ছে মীরা, গলা দিয়ে শব্দ বের হবে কিনা সন্দেহ, সেখানে গান!
আবিদ মিটিমিটি হাসছে, মীরার মুখের দিকে তাকিয়ে- কি হলো, গান শোনাবে না?
-অন্য দিন শোনাবো, অনেক চেষ্টার পর নত স্বরে এটুকু বলতে পারলো মীরা।
-অন্য দিন ও শুনবো, আজ বাসরের রোমান্টিক পরিবেশে সদ্য বিবাহিতা স্ত্রীর কন্ঠে গান- উহঃ হৃদয়ে পুলক ভরে শিহরণ বয়ে যাচ্ছে, শুরু করো প্রিয়তমা।
বিব্রত মীরা কিছুতেই সহজ হতে পারে না-
-আচ্ছা, ঠিক আছে, আমি এখনই আব্বাকে ফোন দিয়ে বলছি- আপনার মেয়ে আমাকে গান শোনাতে চাইছে না।
বলেই হাত বাড়িয়ে ফোনটা টেনে নেয় আবিদ- কি সবর্নাশ সত্যিই দেখি নাম্বার টিপতে শুরু করলো- পড়েছো মোগলের হাতে- খানা খেতে হবে একসাথে।
স্বামীর হাত থেকে ফোনটা নেবার জন্য ধস্তাধস্তি শুরু হয়- আবিদ মুচকি হাসে।
– নাগো প্রিয় সখী, আমার সাথে পারবে?
কি আর করা চোখ বুজে গান শুরু করে মীরা- উপরে উল্লেখিত গানটা- গাইতে গাইতে টের পায় আবিদ বলিষ্ঠ মুঠোয় ওর হাত চেপে ধরেছে- গান পুরো শেষ করতে পারেনি- তার আগেই স্বামীর বাহুবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পড়ে- মধুরাতি মধুময় হয়ে ওঠে।
আজ রিনিকে ঘুম পাড়াতে পাড়াতে হঠাৎ গানটা গাইতে থাকলো এবং এই গানটা কখনো শেষ করতে পারেনি, কিছুদুর শোনার পরই আবিদ ওকে বুকে টেনে নিয়ে আদর সোহাগে ভরিয়ে দিয়েছে- আজও শেষ করতে পারলো না- আকুল কান্নায় ভেঙে পড়লো মীরা।
বিয়ের পর দুটো বছর রূপকথার মত কেটে গেছে, প্রেমিক স্বামী পেয়ে মীরা নিজেকে ধন্য মনে করেছে- সুখ , আনন্দ মিলিয়ে স্বপ্নের মত দিনগুলো কেটে গেছে তারপর রিনি পেটে এলো- প্রথম দিকে অতটা নিষ্ঠুর ছিলো না আবিদ- খুব বমি হোতো মীরার, কিছু খেতে পারতো না, আবিদ সহানুভূতির সাথে মীরার যত্ন করতো, বাইরে থেকে খাবার নিয়ে আসতো, মীরা কখনো খেতো কখনো পারতো না।
মুস্কিল হোলো, প্রায় সব কিছুতে মীরা গন্ধ পেতো, পেট গুলিয়ে বমি আসতো এবং স্বামীর গায়ের গন্ধ ও অসহ্য লাগতো, ওর কাছেই যেতে পারতো না মীরা, এভাবেই তিন চার মাস পযর্ন্ত কাটার পর একটু ঠিক হলো মীরা কিন্তু আবিদের চাহিদা মিটাবার মত শারীরিক ক্ষমতা থাকলো না।
আবিদ তো মন থেকে মীরাকে ভালোবাসেনি, শুধু রূপসী রমনীর মোহ জালে আটকে ছিলো, নইলে গর্ভকালীন অবস্থায় মেয়েদের কি শারীরিক সমস্যা হতে পারে, সে কি জানতো না? যে সময় স্বামীর সহায়তা সবচেয়ে বেশী প্রয়োজন ছিলো ঠিক সে সময়ই স্বার্থপরের মত আবিদ মীরার পাশে থেকে সরে গেলো- শুধু মাত্র তার দৈহিক চাহিদা মিটাতে অক্ষম- এই ছুতোয় সব মায়া মমতা বির্সজন দিয়ে দুরে বহু দুরে চলে গেলো যার নাগাল মীরা আর এই জীবনে পেলো না।
রিনি বড় হতে লাগলো, বাবাকে নিয়ে ওর অনেক প্রশ্ন কিন্তু মাকে বাবার কথা জিজ্ঞেস করলে কেমন হয়ে যায় , লুকিয়ে কাঁদতেও দেখেছে, শান্ত অথচ বুদ্ধিমতি রিনি চুপ থেকেছে । এরপর মাকে কিছু জিজ্ঞেস করা থেকে বিরত থেকেছে।
এরমধ্যে একদিন হঠাৎ রাজু এসে উপস্থিত। ওকে দেখে অবাক হলো মীরা কারণ বহুদিন হলো আবিদ তেমন কিছু আর পাঠায়না, মাঝে সাঝে কিছু টাকা ধরিয়ে দেয় মীরাকে, যা দরকার কেনার জন্য, এছাড়া রিনির পড়ার খরচ আলাদা- এই দয়াটুকু সে করে।
তাই রাজু যখন সেই ভাবে মাথা নীচু করে মীরার সামনে দাঁড়ালো, বিস্মিত মীরা প্রশ্ন করলো-
-কি ব্যাপার রাজু! ভালো আছো? সাহেব পাঠিয়েছেন?
একটু চুপ করে থেকে সংক্ষেপে বলে- না, ম্যাডাম
-তাহলে!
-রিনি মামনিকে দেখতে এসেছি,
বলে হাতে ধরা একটা প্যাকেট এগিয়ে দেয় রাজু, অবাক মীরা হাত বাড়িয়ে প্যাকেটটা নেয় কিন্তু না খুলে রাজুর সরল নিস্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে, বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে ওঠে, আহারে- তার এমন একটা ছোট ভাই যদি থাকতো।
রাজুকে সোফায় বসতে বলে নিজেও বসলো কিন্তু রাজু সোফায় না বসে মেঝেতে বসতে যেতেই মীরা স্নেহের সুরে বলে- শোনো রাজু, তুমি সাহেবের পিয়ন হতে পারো কিন্তু আমার কাছে তুমি আমার ছোট ভাই, এবং একজন মানুষ, ওঠো সোফায় বসো।
এই কথাতে রাজুর চোখে পানি চলে এলো, খুব সংকোচের সাথে সোফায় বসলো, মীরা প্যাকেট খুলে দেখে চিপস, চকলেট আর সুন্দর একটা চুলের ব্যান্ড।
-এগুলো রিনির জন্য এনেছো?
-হ্যাঁ ম্যাডাম,
-ম্যাডাম নয় আমাকে তুমি আজ থেকে আপা বলে ডাকবে।
তারপর বেশ কিছুক্ষণ থাকলো রাজু, রিনিকে কোলে নিয়ে আদর করলো। মীরা রাজুকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলো, বাবা আছেন দেশের বাড়িতে, নিজের মা নেই, সৎ মা, সৎ ভাই বোন- তারা ওকে পছন্দ করে না, বাবাও নির্বিকার, তাই দেশে সে কমই যায়- অফিসের কাছে সস্তার একটা মেসে থাকে, সেখানেই খায়।
নাস্তা খেয়ে বিদায় নিয়ে রাজু চলে যাবার সময় রিনি বলে- মামু আপনাকে ধন্যবাদ, আবার আসবেন, আমার জন্য এত কিছু এনেছেন, আমি খুশী হয়েছি।
এরপর থেকে প্রায়ই রাজু আসে, কিছু না কিছু হাতে করে আনে, মানা করলেও শোনে না, রিনির সাথে খেলা করে, ওর স্কুলের গল্প শোনে। মীরা ভাবে, ছেলেটার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই, কেউ কাউকে ভালো করে চিনিও না, অথচ দুদিনেই কত আপন হয়ে গেলো, আর ঘরের সবচেয়ে আপন মানুষটা এত পর হয়ে গেলো যে চেনা মুস্কিল।
রাজু এলে রিনি যে খুশী হয়, সেটা ওর মুখ দেখলেই বোঝা যায়- এই আট দশ বছর বয়স পযর্ন্ত শুধু মা ছাড়া আর কারো স্নেহ ভালোবাসা আদর তো পায়নি মেয়েটা।
কি দুর্ভাগ্য মেয়েটার- বাপ থাকতেও না থাকার মত- রিনির কি দোষ! ও তো সেধে এই পৃথিবীতে আসেনি, দোষ তো মীরারও ছিলো না, সেও সেধে আবিদের কাছে আসেনি- কোন অজানা অপরাধে নিষ্ঠুর মানুষটি তাদের কাছে থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলো!
না মীরা এখন আর এসব নিয়ে ভাবে না, মন খারাপ করে না- সমস্ত প্রাণ মন উজার করে রিনিকে বড় করতে থাকে, বাপের অভাব বুঝতে দেয়না।
মীরা নিজের ভাগ্য মেনে নিয়ে বিশেষ করে বাচ্চাটার জন্য ত্যাগ স্বীকার করেও অমানুষ স্বামীর সংসার করতে চেয়েছিলো কিন্তু আবিদ সেই সুযোগ আর তাকে দেয়নি- সংসার ভাঙনের সুর বেজে ওঠে- নতুন করে মীরাকে বুঝিয়ে দেয়, আবিদের জীবনে মীরার কোনো স্থান নেই, বির্সজনের বিষন্ন মলিন আবহ মীরাকে জোর করে ঠেলে দেয় দুরে বহু দুরে ।
চলবে-