পদ্মপাতায় জল (পর্ব- ৫ ): নাজনীন রহমান

দোকানে বসে রিনি হিসাব দেখছিলো, কদিন বাইরের কাজে ছোটাছুটি করতে হয়েছে, দোকানে প্রচুর কাজ জমে গেছে। এমন সময় হৈরৈ করতে করতে ঢুকলো আলো- ব্যস- ভাবলো রিনি, কাজের দফারফা হয়ে গেলো, দস্যি মেয়েটার সামনে আর কি কাজ করতে পারবে?

রিনির পাশের চেয়ারে বসে আলো বললো-

-এই যে ম্যাডাম কাজ করা হচ্ছে? নাকি মন খারাপ?

-মন খারাপ হবে কেন! এই হিসাব দেখছিলাম, তা তুই কোথা থেকে, সাহেব কই?

-বলছি, লেবু চা আনা তো, ফাইন চা বানায় এখানে।

বলে অকারণে একটু হাসলো আলো, কথায় কথায়

হাসা সহজ সরল মেয়েটার মুদ্রা দোষ। রিনি দোকানের এক কর্মচারীকে চা আনতে পাঠায় তারপর  খাতাপত্র একপাশে সরিয়ে জিজ্ঞেস করে-

-তারপর বান্ধবী, কি খবর, কোনো প্রোগ্রাম আছে নাকি, হঠাৎ এই সময়!

-তোর কাছে আসতে আবার সময় লাগে নাকি? চাচার বাসায় যাচ্ছিলাম, ভাবলাম তোর এখানে একটু  চা খেয়ে যাই- কর্তা অফিসে।

চায়ে চুমুক দিয়ে তৃপ্তির শব্দ করে আবার বলে আলো- কোনো খবর পেলি খালুর?

নিমিষেই রিনির হাসিখুশি মুখটা গম্ভীর হয়ে গেলো, একটু চুপ থেকে নীরস স্বরে বললো-

-না, কোনো খবর পাইনি, খোঁজ তো করলাম অনেক।

আলো রিনির প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করে দমে গেলো তারপর বিষন্ন স্বরে বললো-

-জানি, তোর শুনতে ভালো লাগে না তবুও বলছি , হাজার হলেও উনি তোর জন্মদাতা- তাছাড়া খালাম্মাকে তুই কথা দিয়েছিলি।

-হ্যাঁ, শুধু সেজন্যই, নইলে  আমার কোনো আগ্রহ নেই।

-আচ্ছা রিনি একটা কাজ করলে হয় না? কয়েকটা দৈনিক কাগজে বিজ্ঞাপন দিলে কেমন হয়? খালুর ছবি আছে তোর কাছে?

-বুদ্ধিটা মন্দ নয় তবে ঐ ভদ্রলোকের কোনো ছবি নেই, আমাদের কাছে কখনো ছিলো না।

রিনি কখনো আবিদকে বাবা বলে না, বলতে পারে না- ওর স্মরণে শুধু আছে ভয়াবহ এক দুঃখজনক স্মৃতি।

এক অবুঝ শিশু -বাবা বাবা- বলে ছুটে যেতো একজনের কাছে-  আদর করার বদলে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে রুক্ষ্ম কর্কশ কন্ঠে মানুষটা ধমকে উঠতো- সর, সরে যা- অপদার্থ মায়ের সন্তান, আমার কাছে কেন? তুই আমার কেউ না-

এই রুঢ় প্রত্যাখান শিশু বুঝতো না, ধাক্কায় মাটিতে পড়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতো-  মা, তার মা ছুটে এসে বুকে তুলে সরিয়ে নিয়ে আদরে সোহাগে মেয়েকে ভোলাতো।

শিশুকালের সেই কথা আশ্চর্যজনক ভাবে মনে আছে রিনির- দুচোখে অশ্রু জমে ওঠে। ওর চোখে পানি দেখে আলো বিচলিত হয়ে যায়, কিন্তু রিনিকে কিছু বুঝতে না দিয়ে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু দিয়ে বলে-

-থাক ওসব কথা, তুই তখন প্রোগ্রামের কথা বলছিলি না? আরে তোকে নিতেই তো এসেছি, চাচার বাসায় দুপুরে খাওয়া দাওয়া করে বিকেলে শিল্পকলা একাডেমিতে যাবো- দারুণ একটা নাচের শো আছে, জুয়েল আগেই টিকিট কিনে রেখেছে, অফিস করে ও চলে যাবে।

কান্নাভেজা চোখ নিয়ে হাসলো রিনি, ম্লান সুরে বললো-  আমি কারো বাসায় যাই নারে, কেউ সাধারন কিছু প্রশ্ন করলে আমি কোনো জবাব দিতে পারবো না, কি দরকার, তাছাড়া অনেক কাজ জমে আছে।

-আমার চাচী মারা গেছেন, বাসায় শুধু চাচা আর চাচাতো ভাইই থাকেন, চাচা খুব ভালো মানুষ, আমাদেরকে দুপুরে খেতে বলেছিলেন, জুয়েল তো যেতে পারবে না, তোকে নিতে বলেছে, তোর গেলে খারাপ লাগতো না, আর চাচা কাউকে ব্যক্তিগত কোনো প্রশ্ন করেন না।

-আমাকে বাদ দে, সত্যিই অনেক কাজ আছে।

-কাজ আছে তাই না? সেই সাথে পুরনো কথা মনে করবি আর কাঁদবি, না সখী, আমি সেটা হতে দেবো না, আমার সাথে তোমাকে যেতেই হবে।

-কি যে বলিস না? দোকানে মানুষের সামনে কাঁদবো,

-তুমি সব পারো, যাকগে, শোন, চাচার বাসায় যাবো না, ফোনে চাচাকে বলে দিচ্ছি, এখানেই কত রকম খাবার পাওয়া যায়, খেয়ে নেবো, তুই বরং হাতের কাজ শেষ কর জলদি, আর একটু চা আনা।

পড়েছো মোগলের হাতে, খানা খেতে হবে এক সাথে- আলো সহজে ছাড়বে না, যেতেই হবে।

দোকানে দক্ষ, বিশ্বস্ত ম্যানেজার, কর্মচারী রয়েছে, বিশেষ অসুবিধা হয় না, ওদের ওপর নিশ্চিন্তে ভরসা করা যায়- নাছোড়বান্দা আলোকে এড়াতে পারবে না তাই বেছে বেছে সেরা মানুষদেরই নিয়েছে দোকানে- যাতে  তার অবর্তমানে কোনো অসুবিধা না হয়।

দোকানের কাজ মোটামুটি সারতে পারলো রিনি তারপর ফুড কোর্টে যেয়ে খেয়ে নিলো ওরা।

ওরা যখন একাডেমিতে পৌঁছলো তখনও শো শুরু হয়নি। বাইরে দেখা গেলো জুয়েল দাঁড়িয়ে আছে।

ওদের দেখে হাসিমুখে এগিয়ে এলো, সঙ্গে একজন  সুদর্শন পুরুষ, রিনি অবাক, আর কারও তো আসার কথা নেই, তবে এই ভদ্রলোক কে!  তবে ও কিছু জিজ্ঞেস করলো না- জুয়েল বললো,

-তুমি এসেছো, খুশী হলাম, আলো পরিচয় করিয়ে দাও।

আলো তো রিনির নাড়ী নক্ষত্র সব জানে, অন্য কোনো পুরুষে ওর আগ্রহ নেই , কিন্তু এভাবে তো চলতে দেওয়া যায় না, তাই স্বামীর সাথে পরামর্শ করেই আজকের প্ল্যান করেছে, জানা কথাই, আগে জানলে রিনি কিছুতেই আসতো না- খুব নিরীহ মুখ করে আলো রিনিকে  বললো-

উনি হচ্ছেন আমার একমাত্র চাচাতো ভাই আশিক আহমেদ, বাংলাদেশ বিমানের অভিজ্ঞ এবং জনপ্রিয় পাইলট।

-ভাইজান, আর ইনি হচ্ছেন রিনি- আমার একমাত্র স্ত্রীর একমাত্র প্রিয় বান্ধবী, সফল ব্যবসায়ী।

আলো স্বামীর পরিচয়ের ধরন দেখে মুখ বাঁকিয়ে বলে-  ইশ! ঢং দেখে বাঁচিনা, স্ত্রী তো একটিই হয় দুইমাত্র কিভাবে?

সাড়ম্বরে পরিচয়ে আশিক বিব্রত বোধ করছিলো- রিনির সাথে কুশল বিনিময় শেষ করে জুয়েলকে সে বললো- গৃহ যুদ্ধ গৃহে যেয়ে কোরো ভাই এখন কি করবে সেটাই ভাবো। স

অবাক আলো বললো- কেন ভাইয়া!  নাচ দেখবো, ঐ তো সবাই হলে যাচ্ছে।

-আমার এখন নাচানাচি দেখতে ইচ্ছে করছে না,

-বাঃ বেশ ভাই, তা তোমার এখন কি করতে ইচ্ছে করছে বলে ফেলো।

আসলে আশিক চাইছে রিনির সাথে কথা বলতে কিন্তু নতুন পরিচয়- কিভাবে বলে।

রিনির একদম অসহ্য লাগছিলো, বোকা তো নয় সে, এদের দুজনের ষড়যন্ত্র ঠিকই বুঝতে পেরেছে কিন্তু আলোর সাথে পরে বুঝবে, এখন উপস্থিত কি করা যায়? শুধু নাচ নয়, আশিকের উপস্থিতিও বরদাস্ত হচ্ছিলো না- বিশেষ ভদ্রলোকের মুগ্ধ দৃষ্টি তার প্রতি আরো অসহনীয়- সে অম্লান ভাবে বলে দিলো যে তার খুব মাথা ব্যথা করছে, বাসায় যাবে।

পিছু হঠার ছেলে জুয়েল নয়, বললো- তোমাকে আমি দারুণ কফি খাওয়াবো রিনি, এখানেই পাওয়া যায়, খেলেই যাদুর মত ব্যথা শুধু নয়, মাথাও গায়েব হয়ে যাবে-

রিনি হাসলো না, বিরক্তি চেপে দাঁড়িয়ে রইলো, আলো তো বুঝলো বান্ধবী ক্ষেপেছে, মিনমিন করে বললো- থাক, ও যখন চাইছে না, আজ বাদ দাও।

-টিকিট কি হবে?

-ছিঁড়ে ফেলে দাও।

-বেশ, নিজেই প্ল্যান করলে আর এখন বলছো- এইজন্যই কবিগুরু বলেছিলেন যে বৎস মহিলাদের কথায় ওঠবস করিয়ো না, ইহাতে লস খাইবার চান্স প্রবল।

কটমট করে স্বামীর দিকে চেয়ে আলো বললো-

-উনি কোন বইতে এটা বলেছিলেন?

-ইয়ে কোন বই- বই!না তাহলে বোধহয় আমাদের জাতীয় কবির কথা এটা- উঃ উনি নিজে পুরুষ তাই পুরুষের মর্মবেদনা ভালোই বুঝেছিলেন।

এবার আর হাসি চাপা গেলো না, সবার সাথে রিনিও হেসে ফেললো, কিন্তু থাকতে রাজী হলো না  সোজা বিদায় নিয়ে গাড়িতে বসলো।

হতাশ হয়ে জুয়েল বললো- না ভাইজান, আপনার কোনো আশা নেই, ও মেয়ে ভাঙবেও না, মচকাবেও না, তার চেয়ে আপনি বরং সুন্দরী কোনো বিমানবালাকে পটিয়ে ফেলুন- সে কাজ বরং অনেক সহজ হবে।

 

জুয়েলের এত কথার শেষে মুগ্ধ আশিক বললো-

-হাসলে রিনিকে আরো কি চমৎকার লাগে, তুমি  এত বিখ্যাত সব বাণী শোনালে- এটাও জানো নিশ্চয়ই- একবার না পারিলে দেখো শত, না না হাজার বার।

মলিন সুরে আলো বললো- তোমরা তামাশা করছো? আমি চিনি ওকে, এরপর আমার সাথে কথা বলবে কিনা কে জানে।

-ভাইজান আপনাকে রিনির কথা সবই বলেছি, জানি আমাদের ওপর রাগ করবে, কিন্তু আমরা ওর ভালো চাই এটা ও জানে, ভবিষ্যতে কি হবে বলতে পারছি না, তবে আপনি হার মানবেন না, চেষ্টা চালিয়ে যান, আমরা তো আপনার সাথেই আছি।

অন্যমনস্ক হয়ে রিনির চলে যাওয়া দেখলো আশিক- মনে মনে বললো- এই রমণীরত্ন আমার, ওকে আমার জীবন থেকে হারিয়ে যেতে দেবো না- ও আমার, শুধুই আমার ।

আজ বসুন্ধরার সাপ্তাহিক ছুটির দিন, ছুটি থাকলে বিশেষ বাইরে যায় না রিনি, যদি না আলো কোথাও নিয়ে যায়-  যে জিনিস আলো আর জুয়েল, কোনো না কোনো প্ল্যান ওদের থাকেই-  আলো অবশ্য দুদিন যোগাযোগ করেনি, রিনি ঐদিন রাগ করে চলে যেতে ঘাবড়ে গেছে, তবে আলোর ব্যাপারে নিশ্চিত করে কিছু বলা যায় না।

ভাবতে না ভাবতেই কলিং বেল বেজে উঠলো, সবে নাস্তা সেরে একটা গল্পের বই নিয়ে শুয়ে শুয়ে পড়বে, তা বোধহয় হলো না- খালার উচ্চ কন্ঠের কথা আর আলোর সোরগোল শুনেই বুঝলো রিনি হয়ে গেলো ওর আলস্য করা।

-খালা জলদি কফি নিয়ে এসো-

বলতে বলতেই হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকলো আলো- আস্তে কথা বলা, ধীরে চলাফেরা করা আলোর ধাতেই নেই, রিনির দিকে তাকিয়ে হেসে বললো-

-ম্যাডামের শরীলডা ভালা? রাগ কমেছে, বকাবকি করবি নাতো?

বলেই ধপাস করে রিনির পাশে বসে ওকে জড়িয়ে ধরলো- ব্যাজার মুখে রিনি বললো-

-যে অপরাধ করেছো, শূলে চড়ালে তবে আমার রাগ কমবে।

-তুই যে বেরসিক মানুষ, সেটাতো জানি, তবে আমি অপরাধী নই, জুয়েলের মাথা থেকে এই গর্হিত বুদ্ধি বেরিয়েছে।

-আহা তুমি কিছু জানো না? সেরিল্যাক খাওয়া বেবী? যা কোনো কথা নেই তোর সাথে।

-রাগ করে না রাগুনী, রাঙা মাথায় চিরুনী, বর আসবে এখুনি, নিয়ে যাবে তক্ষুনি।

হাসতে থাকে আলো, খালা কফি নিয়ে এলো সাথে কাজু- ওদের সামনে ট্রেটা নামিয়ে বললো-

-আম্মু কি রান্না করুম? আলো মা কি খাইবা কও

-না না খালা তোমাকে কষ্ট করতে হবে না, আমরা এখনি বেরিয়ে যাবো।

-সেটি হবে না, আমি তো কোথাও যাবোই না, তোকেও যেতে দেবো না, খালা মোরগ পোলাও করো, এই পাগলীর কথা শুনে দরকার নেই।

-না খালাতো লক্ষ্মী, অন্য দিন তোমার হাতের মোরগ পোলাও খাবো, আজ থাক।

খালা কি করবে বুঝতে না পেরে গজগজ করতে করতে প্রস্থান করলো- দোনোজনেরই মাথায় ছিড আছে।

-রিনি তোর আসলে মোগল আমলে জন্মানো উচিত ছিলো, হেরেমে বন্দী, চাঁদ সূর্য দেখা বারণ, পতিদেবতা ছাড়া কারো মুখ দেখলেই ব্যস তুই ফিনিস।

রাগ করতে যেয়েও হেসে ফেললো আলো, তারপর

-আচ্ছা, তুই আমাকে বিশ্বাস করিস? ভরসা আছে আমার ওপর? তোর কোনো ক্ষতি বা খারাপ হোক- সেটা কি আমরা চাইতে পারি?

-আঃ এই ফালতু কথা না বলে আমাকে কি করতে হবে, সেটা বলে ফেলো বাছাধন, তোমাকে আমার চিনতে বাকি আছে?

-বেশ শোন তবে- নীচে গাড়িতে অপেক্ষা করছে আশিক ভাই, তুই চট করে তৈরী হয়েনে, এমনিতেই দেরী হয়ে গেছে, বসে বসে আমার মুন্ডুপাত করছে।

চকিতে ব্যস্ত হয়ে উঠে দাঁড়ায় রিনি অসন্তষ্ট হয়ে বলে- তোর আক্কেল হবে না কখনো, ভদ্রলোককে এতক্ষণ নীচে রেখে এসে দিব্যি কফি খাচ্ছিস, গল্প করছিস, অন্য  পুরুষকে আমি সহ্য করতে পারি না, সে ভিন্ন ব্যাপার, তাই বলে আমার বাসায় এসে গাড়িতে বসে থাকবে? খুব অন্যায় করেছিস।

-তোর কথা শেষ হয়েছে? ভদ্রতা করিস পরে, সে ওপরে আসবে না ম্যাডাম, জলদি তৈরী হয়ে চল নীচে।

-আমি কোথাও যাবো না, ওনাকেই ওপরে আসতে বল।

-রিনি আমার কথা রাখ, আমাকে দিয়ে তোর কোনো অমঙ্গল হবে না, আর কথা না বলে চলতো।

এই ছিটগ্রস্ত মেয়েকে এড়ানো যাবে না, ঝটপট তৈরী হয়ে নীচে এলো ওরা।

আশিক ওদের দেখে হেসে বললো- কেমন আছেন? তারপর আলো এই তোর দশ মিনিট?

-আমি কি জানি? আমার বান্ধবী কেমন কঠিন চিজ জানো তো না? একি তোমার ককপিট পেয়েছো যে বসে ইঞ্জিন চালু করলে আর গড়গড়িয়ে চলতে শুরু করলো? এর নাম হচ্ছে রিনি, আচ্ছা চলি তাহলে, তোমরা যাও।

আলোর হাত চেপে ধরলো রিনি- কি শুরু করলি!  তুই যাবি না!

ফিসফিস করে আলো বললো-  বর আসবে এখনি, নিয়ে যাবে-  ( গলা চড়িয়ে ), আমার ভাইকে তুই মাস্তান ভেবেছিস? ‘ এ ‘ ক্লাস পাইলট, রীতিমত শ্রেষ্ঠ ট্রেনিং পাওয়া মানুষ, নিশ্চিন্তে চলে যা।

-আঃ তোদের কথা শেষ হবে না? গাড়িতে ওঠ তোকে নামিয়ে দেবো।

-না দরকার নেই ,  আমি চলে যাবো, তোমরা যাও।

বলেই একরকম দৌড়ে গেট দিয়ে বেরিয়ে গেলো আলো।

আজকে আরো আর্কষণীয় লাগছে আশিককে, নীল শার্ট- কালো প্যান্ট পরেছে, চোখে সান গ্লাস- গাড়ির সামনের দরজা হাত বাড়িয়ে খুলে দিয়ে সহাস্যে বললো-  ম্যাডাম এখানেই বসুন, পিছনে বসলে লোকে আমাকে ড্রাইভার ভাববে, যদিও চালকের কাজই করি, তবু সেই বিশালতার সাথে এই পিচ্চির কি তুলনা হয়?

কোনো তর্ক না করে নীরবে গাড়িতে উঠে বসলো রিনি, আশিকের গাড়ি চালানোর ধরনটা আলাদা, কি স্মার্ট ভাবে চালাচ্ছে, হাজার হোক শিক্ষিত ড্রাইভার- মনে মনে হাসলো রিনি, হু বাবা যতই তুমি কসরত করো- আমি এসবে ভুলছি না।

কিছুক্ষণ চুপচাপ তারপর রিনিই জিজ্ঞেস করলো

-কোথায় যাচ্ছি?

-গেলেই দেখতে পাবেন, এই ভীড়ের মধ্যে গাড়ি চালানো খুব কঠিন ব্যাপার, আকাশ পথে এই প্রবলেমটা নেই।

আর কথা বলতে ইচ্ছে করলো না রিনির- আলোটা এমন ভাবে ফাসালো- লোকটা বেশ ডাট দেখাচ্ছে, ঈস কথা বলার জন্য মনে হয় আমি মরে যাচ্ছি- বাইরের দিকে চেয়ে চুপচাপ বসে রইলো রিনি, টের পেলো না যে আশিক ওকে মুগ্ধ নয়নে বার বার ফিরে ফিরে দেখছে।

ধানমন্ডির একটা ছিমছাম ছোট দোতলা বাড়ির সামনে থেমে হর্ণ বাজাতেই দারোয়ান এসে গেট খুলে দিতেই আশিক ভিতরে ঢুকে পড়লো। বাড়ির সামনে ফুলের বাগান, কত রকম কত রঙের গোলাপ ফুঁটে আছে- রিনির চমক ভাঙলো- আশিক গাড়ির দরজা খুলে নামতে বলছে।

বাড়িটা কেমন নীরব, লোকজন আছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না-  কেমন একটু ভয় করে উঠলো রিনির

-কার বাড়ি এটা? কোথায় নিয়ে এলেন আমাকে?

-ভিতরে গেলেই দেখতে পাবেন, আসুন।

-না বললে আমি যাবো না।

-আচ্ছা ভীতু মেয়ে তো আপনি!  আমি আপনাকে অন্য রকম ভেবেছিলাম, এটা আমাদের বাড়ি, এখানে আমি, বাবা আর কিছু কাজের লোকজন থাকে, হলো? নামুন এখন, বাবা অনেক ক্ষণ অপেক্ষা করে আছেন।

ড্রয়িং রুমে বসে আছে রিনি, চারদিকে রুচিশীলতার পরিচয়, তাকিয়ে দেখছে আর ভাবছে- আশিক ওর বাসায় এনে বাবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে, কি মতলব? এত লুকোচুরিই বা কেন!  প্রথমেই বলতে পারতো যে ওর বাসায় যাচ্ছে- কিছু একটা ব্যাপার তো আছেই- শক্ত হয়ে বসে থাকলো রিনি, ব্যাপার যাই হোক ওকে টলানো সহজ নয়- কিন্তু রিনির সব হিসাব এলোমেলো হয়ে গেলো।

আশিক ঘরে ঢুকলো বৃদ্ধ এক ভদ্রলোককে নিয়ে- কাঠামোটা আশিকের মতই কিন্তু বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন, চুল মাথায় যা আছে সব সাদা-  মুখে এমন এক প্রশান্তি ফুঁটে আছে, দেখলেই শ্রদ্ধা হয়-  নিজের অজান্তেই রিনি দাঁড়িয়ে গেলো।

-আমার বাবা, বাবা ও রিনি।

সালাম দিতেই ওর দিকে চেয়ে হেসে ইশারায় বসতে বললেন, সেই হাসিতে ছিলো আশ্বাস, স্নেহ মমতার ছায়া।

ছেলের দিকে চেয়ে বললেন- তুমি নাস্তার ব্যবস্থা করো, আমি ওর সাথে কথা বলি।

আপত্তি জানালো রিনি- আমি কিছু খাবো না।

-তাই কি হয় মা? আমার বাসায় প্রথম এসেছো।

আশিক বেরিয়ে যেতে যেতে মনে মনে বললো-

-বাবা জানো তো না, কি ভয়ানক জেদী মেয়ে।

কিছুসময় চুপ করে থেকে রিনিকে বললেন উনি-

-মা, লজ্জা সংকোচ কোরো না, এ তোমার নিজের বাড়িই মনে করো।

রিনি ঘেমে উঠলো- যে মেয়ে কাউকে পরোয়া করে না, নিজের খুশী মত চলে, সেই মেয়ের এখন কি হলো!  হঠাৎ আশিকের বাবার কথায় চমকে উঠে রিনি সোজা হয়ে বসলো, দুচোখে রাজ্যের

বিস্ময়- অপলক তাকিয়ে রইলো ওনার দিকে-

-রিনি মা, তোমার বাবার নাম আবিদ চৌধুরী, মা মীরা-

মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লেও এতটা বজ্রাহত হোতো না রিনি, স্তম্ভিত হয়ে পলকহীন চেয়ে রইলো

-আমার নাম আলীম- আলীম আহমেদ, তোমার নানা আমার বন্ধু ছিলেন, আমার কথা তোমার মা তোমাকে বলেছিলেন কিনা, আমি জানিনা, তোমাকে খুব ছোট দেখেছি, তোমার মনে থাকার কথা নয়।

না রিনির মনে নেই কিন্তু দুঃসময়ের শুভাকাঙ্খী এই মানুষটির কথা মা সবই বলেছেন রিনিকে- এবং সেই সাথে এই অসাধারণ মনুষ্যত্বের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা ভক্তি নিয়ে মেয়েকে কিছু নির্দেশও দিয়ে গেছেন।

সব ভুলে ঝরঝর করে কেঁদে ফেললো রিনি-

-চাচা আপনি!  আপনি সেই মানুষ চাচা!  আমার মাকে- অসহায় মা, কেউ ছিলো না তার পাশে- মা যতদিন বেঁচে ছিলেন আপনার কথা ভোলেননি, মা আমার মা-

আর কিছু বলতে পারেনা রিনি, আকুল হয়ে কাঁদতে থাকে।

আলীম চাচা রিনির মাথায় হাত রেখে নীরবে বসে থাকলেন, ওকে কাঁদতে দিলেন তারপর শান্ত সুরে বললেন- কাঁদিস না মা, নিজেকে সামলা,শান্ত হয়ে বোস লক্ষ্মী মা আমার, তোকে কিছু কথা বলবো, সেজন্যই আশিককে বলেছিলাম তোকে আমার কাছে নিয়ে আসতে।

বুয়াকে ডেকে ঠান্ডা পানি এনে খাওয়ালেন, বাথরুম থেকে হাত মুখ ধুয়ে এলো রিনি, বুয়াকে বলে দিলেন কেউ যেন এদিকে না আসে, তারপর রিনিকে বললেন- সুস্থির হয়ে বসে আমার কথাগুলো শোন, আমি জানি তুই যথেষ্ট শক্ত মনের মেয়ে নইলে একা সংগ্রাম করতে পারতিস না।

আলীম আহমেদ দেরী করেই বিয়ে করেছিলেন- আশিক তার বেশী বয়সের সন্তান, বিবাহিত জীবন তার সুখের হয়নি, ছেলের জন্য অন্য চিন্তা করেননি, ওকে ভালো ভাবে মানুষ করে তোলাই তার একমাত্র ব্রত ছিলো, মীরার মা বাবা মারা যাবার পর, মীরাকে যথা সাধ্য সাহায্য করেছিলেন কিন্তু ইচ্ছে থাকলেও নিজের কাছে আশ্রয় দিতে পারেননি স্ত্রীর কারণে, তাকে দজ্জাল মুখরা মহিলা বললে কম বলা হোতো, দুখিনী মীরাকে ঐ নরকে এনে আরো কষ্ট দিতে চাননি- স্ত্রীর জুলুম তিনি মুখ বুজে সয়েছেন, দুর থেকেই মীরার যা উপকার করার করেছেন, স্ত্রী এবং আবিদ টের পেলে ওনাদের দুজনের কারোই মঙ্গল হোতো না তাই মীরার কাছে থেকে সরে গেছেন, কোনো খোঁজ রাখতে পারেননি।

এই না পারার ব্যর্থতা তাকে যন্ত্রণা দিয়েছে, তিনি অনুতাপের আগুনে পুড়ে ছাই হয়েছেন- তারপর টাইফয়েড হয়ে মারা যায় স্ত্রী, ততদিনে অনেকগুলো বছর পার হয়ে গেছে।

আশিককে তিনি মনের মত করে মানুষ করতে পেরেছেন, ছেলের বিয়ে দেবেন ঠিক করলেন, আশিক তার পিতার অমতে কিছু করে না সুতরাং যেখানে ঠিক করবেন সেখানেই সে বিয়ে করবে- এরমধ্যে আলোর সাথে বসুন্ধরায় যেয়ে রিনিকে দুর থেকে দেখে আর মাথা ঠিক রাখতে পারে না আশিক- তার ইশারাতেই চাচার কাছে আলো রিনির কথা বলে।

-চাচা, ভাইয়ার জন্য মেয়ে দেখছেন? তা দুরে যাবেন কেন? আমার বান্ধবীই তো রয়েছে, চমৎকার মেয়ে, ওর কথা শুনলে এবং ওকে দেখলে আপনি না করতে পারবেন না।

দীর্ঘ সময় কথা বলে আলীম চাচা একটু থামলেন, আর রিনি? রুদ্ধশ্বাসে শুনছিলো আর একজন ভালো মানুষের কষ্টের ইতিহাস।

-যাই হোক মা, তখনও আমি বুঝতে পারিনি যে তুই সেই রিনি, আলো আমার কাছে কিছু গোপন করেনি, সবটা শোনার পর আমি নিঃসন্দেহ হলাম এবং স্থির করলাম বহু বছর আগে যা পারিনি, এখন আমার করণীয় কাজ করবো, এই পৃথিবীতে একা একটি মেয়ের মাথার ওপর আমি- আমার ছেলে ছায়া হয়ে দাঁড়াবো, ওকে আমার একান্ত আপন করে পেতেই হবে তবেই আমার শান্তি।

আশিককে সব জানানো হলো, সেতো আগেই কুপোকাত হয়েছিলো এবং স্বীকারও করে ফেললো যে রিনির কিছু না জেনেই পছন্দ করেছিলো, এখন সব জানার পরে আরো ধরাশায়ী হয়ে গেলো, বাপকে বলে দিলো- এই পুরুষ বিদ্বেষী মেয়েকে কিভাবে সোজা করবে সেটা জানতে চাই না, মোটকথা একে ছাড়া আর কাউকেই আমি বিয়ে করবো না।

-রিনি মা সবই বললাম তোকে, যেহেতু তোর হয়ে আর কেউ নেই বিয়ের ব্যাপারে কথা বলার তাই সরাসরি তোকেই বললাম, লজ্জা করিসনা মা, তোর মনে যা আছে আমাকে বল।

 

রিনি দ্বিধা জড়িত কন্ঠে বললো- চাচা আমি যাকে অনেক দিন থেকে খুঁজছি, তাকে আগে আমার পেতে হবে, আমাকে সময় দিন, এখনই কিছু ভাবতে পারছি না।

-হ্যাঁ, আলো আমাকে বলেছে, তুই আবিদকে খুঁজছিস, ঠিক আছে, তাড়াহুড়োর ব্যাপার নয় এটা, তুই ভেবে চিন্তেই যা করার কর।

আলীম চাচা সেদিন রিনিকে রাতে না খাইয়ে ছাড়লেন না এবং আশিক ওকে বাসায় পৌঁছে দিলো।

সারাপথ রিনি বিশেষ কথা বলেনি- ওর এতদিনের সংস্কার ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে, এই ধাক্কা সামলাতে সময় লাগবে- মায়ের কথা ভেসে এলো কানে- মা, তোর আলীম নানা  আমাকে যে দুঃসময়ে সাহায্য করেছিলেন, তুই কখনো ভুলবি না, আমাকে ঋণী করে রাখলেন, যদি কখনো তাঁর দেখা পাস, আমার ঋণ শোধ করিস।

আজ সময় এসেছে ঋণ শোধ করার, কিন্তু কি করবে রিনি? ওর মন যে এখনো প্রস্তুত নয়- বিতৃষ্ণা যে অন্তরে রয়ে গেছে-

-আচ্ছা আপনি সব সময় এমন মাষ্টারনি মার্কা মুখ করে রাখেন কেন? কেন ভাবেন যে মুখচোখ কঠোর করে রাখলেই কেউ আপনার কাছে আসবে না?

-চুপ করে গাড়ি চালান।

-আপনি পুলিশের চাকরী করলে ভালো হোতো, দেশ অপরাধ মুক্ত থাকতো।

নাঃ লোকটা ভীষণ বাচাল, কতক্ষণে যে পৌঁছাবে, ঘটনার চমকপ্রদ ব্যাপার ঘটে যাওয়ায় রিনির দেহমন অবসাদে ছেয়ে গেছে- আশিক বললো

-রিনি আমি কি তোমাকে তুমি বলতে পারি?

-না পারেন না-

কেন? আশিক বললো।

-কেন আবার? আমি চাই না তাই।

-কিন্তু আমি যে চাই, এত কঠিন হলে আমি তো মারা পড়বো।

-গাড়ি চালাচ্ছেন না গরুর গাড়ি? এই গতিতে চালালে কতক্ষণে পৌঁছাবো?

-মুখে কিছুই আটকায় না দেখি, আমাকে গরু বলা হলো।

-সেকি কখন বললাম! ভীষণ মিথ্যেবাদী তো?

রাগ করতে যেয়ে হেসে ফেললো রিনি।

অবশেষে বাড়ি পৌঁছে গেলো, গাড়ি থেকে নেমে চলে যাবে, আশিক ডাকলো- বাড়ি পৌঁছে দিলাম একটা ধন্যবাদ ও জানালেন না?

-ধন্যবাদ, তবে একটা কথা বলতেই হয়, ধানমন্ডি থেকে বনানী আসতে এতটা সময় লাগলো, সন্দেহ আছে আপনি কতটা যোগ্য চালক।

হা হা করে হেসে উঠলো আশিক, রিনিও মুচকি হাসলো, তারপর চলে যেতে উদ্যত হতেই আশিক ডাকলো- শুনুন,

-আবার কি!

-আপনি কি জানেন, হাসলে আপনাকে আরো সুন্দর লাগে?

-না জানি না, জানতে চাইও না।

বলেই ঘুরে গটমট করে চলে গেলো। আশিক যেতে যেতে আপন মনে বললো- বাবা ঘরে এনেছিলেন আগুনের ফুলকি আর আমি আনতে যাচ্ছি আস্ত এক আগ্নেয়গিরি, কপালে খারাবি আছে।

আজ আর বারান্দায় বসলো না রিনি, মন অনেক শান্ত, আশিকের কথাই ভাবছে- মানুষটার মধ্যে রিনির বিরূপ ধারণার কিছুই মেলে না, প্রাণবন্ত সহজ সরল মানুষ- বাইরে কঠোরতা দেখিয়েছে ঠিকই কিন্তু ভিতরে ও দুর্বল হয়ে পড়ছে- তবুও কিছুটা সময় ওর সত্যিই দরকার, এখনই এই ব্যাপারে চিন্তা না করলেও হবে- আগে ওর বাবার খোঁজ পেতে হবে- মানুষটা কোথায় হারিয়ে গেলো? মায়ের শেষ ইচ্ছেগুলো যে ওকে পূরণ করতেই হবে- প্রশান্ত হ্নদয়ে রিনি ঘুমিয়ে গেলো।

দোকানে বসে মন দিয়ে ডিজাইন আঁকছিলো রিনি, কিছু নতুন অর্ডার আছে, তারই প্রস্তুতি, ওর ডিজাইনার আছে কিন্তু সুযোগ সুবিধা হলে নিজেও হাত লাগায়।

-এত মন দিয়ে কি হচ্ছে?

কখন চুপিসারে এসেছে আলো টের পায়নি রিনি।

-দুর, আমি ভাবলাম বুঝি আমার ভাইকে চিঠি লিখছিস।

-হ্যাঁ, ওনার বিরহে তো মরে যাচ্ছি তাই দোকানে বসে দিন দুপুরে প্রেমপত্র লিখছি।

-ওটা লিখতে আবার দিনক্ষণ জায়গা লাগে নাকি!

-ফাজিল, তা কি মনে করে নীরবে আগমন! কোনো মতলব থাকলে কিন্তু আমি নেই।

খুব করুণ সুরে আলো বলে উঠলো- পাষাণী, তোর না হয়  প্লাসটিক হ্নদয়, কিন্তু আশিক ভাই, এত কোমল মনের একটা মানুষ- তার তো তেরটা বেজে গেছে।

-আহারে, তা কি হয়েছে ভদ্রলোকের!

-কি হয়নি তাই বল- রাতে চোখ বুঝলে কিচ্ছু দেখতে পায় না, রাশি রাশি খেয়ে হজম করে ফেলছে, দিনে সূর্য রাতে চাঁদ তারা দেখছে, আরো আছে- বাবাকে মা বলে ডাকছে, বুয়াকে বলছে আন্টি আপনি ভালো আছেন? ড্রাইভারকে সরিয়ে নিজেই গাড়ি চালাচ্ছে আর বলছে আরে প্লেন চালানো কি এত সহজ, দেখি আপনি সরেন, আমাকে চালাতে দিন- আরো ভয়াবহ কান্ড করেছে পাগলা ভাই- বিমানবালাকে রিনি বলে ডাকছে।

হাসতে হাসতে রিনির দম আটকে আসছে- কোনো মতে সামলে নিয়ে মন্তব্য করলো-

-পাগলের ডাক্তার দেখা, ওনার সুচিকিৎসা দরকার।

-ডাক্তারের কাছেই তো এসেছি।

-কি! আমি পাগলের ডাক্তার? গেট আউট-

যখনই এই হাস্যকর কাহিনী শুনিয়েছো এবং নিঃশব্দে ইন করেছো তখনই বুঝেছি তোমার কোনো কুমতলব আছে- নাউ গেট আউট-

নির্বিকারভাবে বলে আলো- ঈস এরও তো অবস্থা ভালো নয়- ইংরেজিতে ধমক দিচ্ছে।

হাল ছাড়া মুখ করে রিনি বললো- বুঝেছি বান্ধবী, এখন কষ্ট করে বলে ফেলো কি করতে হবে আমাকে?

নিমিষেই খুশীতে চোখমুখ ঝলমল করে উঠলো আলোর-

-উঃ তুই কি ভালো- শোন, আশিক ভাইয়ের কালকে ফ্লাইট আছে, বেশ কদিনের শেডিউল, দেশে ফিরতে দেরী হবে তাই আজকে রাতে জম্পেশ একটা ডিনার খাওয়াবে ভাই, তোরও দাওয়াত।

-শুনলাম, তা পালের গোদাটা কোথায়? কদিন যে সাহেবের দেখা পাচ্ছি না?

-কে কার কথা বলছিস?

-বুঝলি না? আমাদের রত্ন বাবাজী।

-ব্যবসার কাজে ব্যস্ত, রাতে দেখা হবে।

-আমাকে কি যেতেই হবে?

-প্লিজ রিনি না করিস না, পাইলট সাহেবের দুর্দশা আর চোখে দেখা যাচ্ছে না।

আরো কিছুক্ষণ কথা বলে চা খেয়ে চলে গেলো আলো।

রিনি এমনিতে শাড়ী বিশেষ পরে না, আজ পরলো- গাঢ় নীল সিল্কের শাড়ী- পুরো জমিনে ছোট ছোট রূপালী বুটি, কালো ব্লাউজ, ওর চুল যেমন মোটা গোছ, তেমনি লম্বা, খোপা সুবিধা হয় না, বেণীই করলো- কপালে নীল টিপ, ঠোঁটে গোলাপি লিপস্টিক, হাল্কা মেকআপ- দুহাতে নীল কাচের চুড়ি, কানে নীল পাথরের ছোট ফুল।

বিমানবন্দরের আগে পাঁচতারা হোটেল রেডিসন ব্লু,বিশাল জায়গায় অবস্থিত অসাধারণ সুন্দর রাজকীয় ব্যবস্থা সমৃদ্ধ হোটেলে গাড়ি থেকে নামতেই রিনি দেখতে পেলো- আশিক ওর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে- রিনিকে দেখে বেচারার অবস্থা কাহিল, স্থানুর মত কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো, অগত্যা রিনি এগিয়ে এসে ডাকলো-

-শুনছেন?

-তুমি রিনি!

মহা মুসিবত, এযে পুরোই পাগল, হাসলো রিনি-

-নাতো আমি রিনির ভুত, ওরা কোথায়?

হুশ ফিরে পেলো আশিক, মুগ্ধ চোখে রিনির আপাদমস্তক দেখলো, তারপর গভীর স্বরে বলল

-ভিতরে চলো, অপেক্ষা করছে তোমার জন্য।

রিনিকে দেখে আলোরা এক দফা হৈচৈ করলো-

-শাড়ীতে তোকে কখনো দেখিনি, কি লাগছে না!

ভাষা হারিয়ে ফেলেছি।

চারজনের একটা টেবিল রিজার্ভ করেছে আশিক

রিনি বসতে জুয়েল মন্তব্য করলো-

-রিনি তোমাকে তো চেনাই যাচ্ছে না, অনেকের হ্নদয়ের স্পন্দন থেমে যাবে যে!

-আমি কি করবো? আর একজনকে বলছি, আমাকে তুমি বলার অনুমতি দেইনি, তুমি বলা নিষেধ।

-আলো এই হিটলারকে বলে দে- আমার যা মন চায় করবো, ওকি আমার গার্জেন নাকি?

-ভাইজান, এখনি যা শুরু করেছো তোমরা- পরে তো দেখি কথা বলার আগে মারামারি করবে- আলোর মন্তব্য,

-আচ্ছা, সে তোমাদের ব্যাপার, তোমরা বুঝবে, খিদে পেয়েছে, খালি পেটে কিছুই জমবে না- জুয়েল বললো।

আশিক ব্যস্ত হয়ে জানালো- এখানে দুরকম ব্যবস্থাই আছে, বুফে এবং টেবিলে বসে অর্ডার করা, যে যেটা পছন্দ করে।

আলোরা বুফেই পছন্দ করলো। রিনি প্লেটে খাবার তুলতে তুলতে দেখলো আশিক ওর পাশেই দাঁড়িয়ে, না দেখার ভাণ করে রিনি একটা শামী কাবাব তুলে প্লেটে রাখতেই, আশিক সেটা তুলে টপ করে নিজের মুখে পুরে দিলো, রিনি চাপা স্বরে বললো- ভালো হচ্ছে না কিন্তু- আশিক আরো একটু কাছে সরে এসে ফিসফিস করলো-

-এর থেকে ভালো আমি পারবো না।

নাহ্, মানুষটা ওর সব নিয়ম নীতি ওলট পালট করে দিচ্ছে, ভালো লাগার অনুভূতিতে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে রিনির শরীর মন।

পছন্দ মত খাবার নিয়ে টেবিলে এসে খাওয়া শুরু করলো ওরা- রিনির প্লেট ভরতি খাবার দেখে আশিক মন্তব্য করলো- মেয়েরা বেশী খেতে চায় না, ডায়েট করে।

রিনি বুঝলো কথাটা ওকেই বলা হয়েছে, সেও ছেড়ে দেবার পাত্রী নয়- আমি খেতে ভালোবাসি এবং সবই খাই, ডায়েট করবো কেন।

আশিক মনে মনে বললো- সেরেছে, এতো দেখছি খেয়েই আমাকে ফতুর করবে, সাথে শাড়ী গয়না তো আছেই।

যাই হোক, নানা রকম হাসি রসিকতার মধ্যে খাওয়া চলছে, এই সময় আলো একটা কথা বললো- রিনি তুই চাচা বলে ডেকেছিস ওনাকে, আসলে হিসাব মত তোর নানা ডাকাই উচিত কিন্তু তাতে আবার সম্পর্ক অন্য রকম হবে, আশিক ভাই তোর মামা হয়ে যায়।

রিনি একটু বিব্রত হয়ে বলে- আমি আসলে সেই সময় মাথা ঠিক রেখে কিছু ভাবতে পারিনি, তোর চাচাকে আমি চাচা বলেই ডেকেছি।

-ফালতু কথা মাথা থেকে বের করে দে, তুই বললি আর আমি মামা হয়ে গেলাম তাই না? মামা বাড়ির আবদার আর কি। ব্যাজার মুখে বলে আশিক-

-আলো তুমি আবার কি ফ্যাসাদের কথা তুললে

রিনি চাচাই ডাকুক, দেখছো ভাই সাহেবের পেরেশানি।

-জুয়েল খাওয়া শেষ করো, আমার ঘুম পাচ্ছে।

 

আশিক রিনির কথায় কান দিলো না, ধীরে সুস্থে খাওয়া শেষ করে প্রস্তাব দিলো সবাই মিলে ছবি তুলবে, আপত্তি থাকলেও রিনিকে ছবি তুলতে হলো, জুয়েলই সেলফিটা তুললো এবং আশিক দিব্যি রিনির পাশেই দাঁড়িয়ে গেলো।

বিদায় নেবার সময় আশিক রিনির দিকে চেয়ে বললো-  এই সন্ধ্যের কথা ভুলবো না, রিনি আসি আবার দেখা হবে, আর একটা কথা- তুমি কি জানো? শাড়ী পরলে তোমাকে ডানা কাটা পরীর মত লাগে?

-না জানি না, জানতে চাইও না, আমাকে তুমি বলা বন্ধ করুন।

বলেই গটগট করে গাড়িতে যেয়ে বসলো রিনি, আশিক মনে মনে বললো- প্রেয়সী, বিয়েটা হয়ে যাক, তখন বুঝাবো কত ধানে কত রাইস।

দোকানে বসে ভাবনার অতলে তলিয়ে আছে রিনি, সবার কথাই ভাবছে- আলোর সাথে আশিকদের বাসায় আর একদিন গিয়েছিলো, আশিক দেশে নেই, ফ্লাইট নিয়ে বাইরে, চাচা ওকে দেখে খুব খুশী হলেন, যথেষ্ট আপ্যায়ন করলেন-  স্নেহের সুরে বলতে লাগলেন- তোর মা অনেক কষ্ট পেয়ে গেছে, তুই আজ বিজয়ী, ধন্য তোর মা, তার আত্মা শান্তি পেয়েছে, আমি গর্বিত তোর জন্য।

 

নরম নত সুরে রিনি বলেছিলো- আমি এখনো বাবার কোনো খোঁজ পাইনি, আমার প্রতিজ্ঞা পূরণ হবে যখন তখনই আমার মা পুরোপুরি শান্তি পাবেন।

-আমি দোয়া করছি মা, তোর প্রতিজ্ঞা আল্লাহ্ অবশ্যই পূরণ করবেন।

সবচেয়ে অবাক রিনি নিজেই- বাইরে যতই গলাবাজি করুক- আশিকের কথা ভাবতে ওর ভালো লাগে- পর মুহূর্তে বিষন্ন হয়ে ভাবলো, আবিদের কোনো খবর এখনো পাওয়া যায়নি।

রিনি লোক মারফত খোঁজ করেছে- আগের ঠিকানায় নেই সে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও নেই- সব কিছু বিক্রি করে দিয়ে কোথায় গেছে, কেউ বলতে পারেনি।

সাধারণত বাসা থেকে খাবার নিয়ে আসে রিনি সাথে, বাইরে খুব একটা খায় না, নেহাত আলোর পাল্লায় পড়লে যা খাওয়া হয় কিন্তু আজ আর কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না, খাবারের বক্স একপাশে সরিয়ে রেখে শুধু লেবু চা খেলো।

আজ প্রায় তিন সপ্তাহের মত হয়ে গেলো বিজ্ঞাপন দিয়েছে কিন্তু কই লাভ হলো নাতো কিছু- বিষাদপূর্ণ মনে ভাবলো রিনি- এই পৃথিবীর কোথায় খুঁজবে মানুষটাকে, তবে কি মাকে দেওয়া কথা ও রাখতে পারবে না?

এমন সময় ম্যানেজার এসে জানালো, একজন ভদ্রলোক ম্যাডামের সাথে দেখা করতে চাইছেন- রিনির কিছু ভালোই লাগছে না- এসময় কারো সাথে কথা বলা বিরক্তিকর, তবু বিরস মুখে তাকে নিয়ে আসতে বললো রিনি।

একটু পরই ম্যানেজার যাকে নিয়ে এলো, তাকে দেখেই রিনি দারুণ চমকে উঠলো- শরীর কাঁপছে- অজান্তেই বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো- রিনির সামনে দাঁড়িয়ে তার বাবা- আবিদ চৌধুরী ।

 

চলবে-

Scroll to Top