পান্থপথে অবস্থিত বসুন্ধরা সিটি- শপিং মল, চারতলায় ডি- ব্লকে সারি সারি পোশাকের দোকান- এই সারিতে বড় একটা জমকালো পোশাকের দোকান রয়েছে, ছোট বড় সবার, নানা বয়সী মেয়েদের চমৎকার সব পোশাক পাওয়া যায়- দোকানের নাম-
মীরার স্বপ্ন- মালিকের নাম রিনি।
রিনির এই দোকানটি আগে অন্য জায়গায় ছিলো
এত বড়ও ছিলো না- রিনির কর্ম দক্ষতা, অধ্যবসায়, পরিশ্রম, আগ্রহ- উদ্দীপনা- সব কিছুর মিলিত ফল- মীরার স্বপ্ন জায়গা করে নিয়েছে এই সুপার শপিং মলে।
জীবন যুদ্ধে আজ জয়ী রিনি। নিজেকে সফল ভাবে প্রতিষ্ঠিত করার তীব্র আকাঙ্খা মীরার স্বপ্নকে সত্যি করেছে। সফল ব্যবসায়ী হিসেবে রিনি সুপ্রতিষ্ঠিত। নিজস্ব গাড়ি- ফ্ল্যাট- সব হয়েছে, মীরা একদা যে ফ্ল্যাটটা পছন্দ করেছিলো, সেটাই কিনতে পেরেছে রিনি।
একদিন কোনো কাজে বনানীতে গিয়েছিলো রিনি, তখন ওর ব্যবসার রমরমা অবস্থা এবং তখনো নতুন ফ্ল্যাট কেনা হয়নি, পুরনোটাতেই থাকছে, কাজ সেরে ফেরার পথে সহসা নজরে পড়লো ফ্ল্যাট বিক্রির বোর্ড টাঙানো- সবিস্ময়ে দেখলো, সেই ফ্ল্যাটটাই- যেটা মা পছন্দ করেছিলো- সঙ্গে সঙ্গে মায়ের বিষাদ হতাশাগ্রস্ত চেহারা মনের পর্দায় ভেসে উঠেছিলো- রাজু মামাকে তো ভোলা একেবারেই অসম্ভব, কি উদার মনের একটা মানুষ।
মামার জমি বিক্রির টাকা মা এতিমখানায় দিয়ে দিয়েছে কিন্তু ব্যাঙ্কে যে টাকাটা রিনিকে নমিনি করা ছিলো, সেটা রেখে দেওয়া হয়েছে, মীরার কথা- রাজুর ইচ্ছে ছিলো, ফ্ল্যাট কেনার টাকা দেবার, এই টাকাটা থাক, ফ্ল্যাট কেনার সময় ওর টাকাও নেওয়া হবে, নইলে ওর আত্মা কষ্ট পাবে।
রিনি আর দ্বিতীয় বার চিন্তা করেনি, ফ্ল্যাট কিনে ফেললো এবং কেনার পর মনের মত করে সাজালো।
মায়ের বেডরুমটা সবচেয়ে সুন্দর করে সাজিয়েছে রিনি। মীরার সেন্ট খুব পছন্দ, ড্রেসিংটেবিলে বিভিন্ন সেরা সুগন্ধি সাজানো- টাটকা তাজা লাল গোলাপ খাটের পাশের ছোট টেবিলে প্রতিদিন রেখে দেয় রিনি। খাটের মাথার ওপরের দেয়ালে মীরার বড় একটা রঙিন ছবি টাঙানো।
ছবির মীরা হাসিমুখে কেবল চেয়ে থাকে আদরের মেয়ের পানে।
রিনির স্নেহময়ী, দুখিনী মা এখন শুধুই ছবি- বেদনাময় স্মৃতি। আজ চার বছর হলো- মীরা নেই- ক্যান্সার, শেষ মুহূর্তে ঘাতক ব্যাধি ধরা পড়েছিলো, ডাক্তাররা কিছুই করতে পারেননি।
মা নেই- এই না থাকাটা রিনির জন্য কতখানি শূন্যতা ও যন্ত্রণার- সেটা সে পলে পলে উপলদ্ধি করছে- এই দুঃসহ বেদনা আর কেউ বুঝতে পারবে না। মা যে কোথাও নেই, চিরতরে চলে গেছে কোন অজানালোকে- এটা মেনে নেওয়া খুব সহজ হয়নি, মনকে বুঝ দেওয়ার জন্য মায়ের শোওয়ার ঘরটা এমন ভাবে সাজিয়েছে, যাতে রিনির মনে হয়, ওর মা কোথাও হারিয়ে যায়নি- আছে, ওর কাছেই আছে- দেয়ালের ছবিটাই যেন রক্ত- মাংসের মীরা হয়ে রিনিকে দোয়া করছে- মমতা মাখা যেন জীবন্ত, দুই চোখের দৃষ্টি বলছে-
-রিনি মা, আমি কোথাও যাইনি রে, তোর কাছেই আছি- সারাজীবন থাকবো।
-ম্যাডাম, দোকান বন্ধ করবেন না? আটটা বেজে গেছে।
কর্মচারীর ডাকে সজাগ হয় রিনি, অতীতের অতলে হারিয়ে গিয়েছিলো সে। আটটায় শপিং মল বন্ধ হওয়ার নিয়ম। প্রয়োজনীয় কাজ শেষে দোকান বন্ধ হওয়ার পর রিনি নীচে নেমে এলো।
পান্থপথ থেকে বনানী- দুরত্ব বেশী নয়।
ক্লান্ত শরীর এলিয়ে দিলো রিনি গাড়ির নরম সীটে, মাথাটা পিছনে হেলিয়ে চোখ বন্ধ করলো।
রাতের শীতল বাতাস শান্তির পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে শরীরে- গাড়ি ছুটে চললো গন্তব্যে। অতীতের দুঃখ- বেদনা ভারাক্রান্ত স্মৃতিতে আবার হারিয়ে গেলো মন।
বেশ কিছু দিন তারা ফ্ল্যাট কেনার আশায় ঘোরাঘুরি করে অবশেষে হাল ছেড়ে দিলো। রিনি মাকে বুঝালো- আপাতত যেখানে আছে ওরা, সেখানেই থাকবে, পরে দেখা যাবে কি করা যায়- আসলে রিনি রাজুকে অকালে হারিয়ে মর্মান্তিক ধাক্কাটা সামলাতে পারেনি, কোনো কিছুতে মন দিতে পারেনা, জ্ঞান হয়ে পযর্ন্ত মাকেই দেখেছে আদর মমতায় ভরিয়ে রাখতে তারপরই এই মামার স্নেহ পেলো সুতরাং এত সহজে কি ভোলা যায় মানুষটাকে?
মাকে এসব কিছু বলেনি, তার বুকেও তো শোকের আগুন জ্বলছে- এরা কেউ রাজুর প্রসঙ্গ তোলে না- সমস্ত উৎসাহ আনন্দ যেন শেষ হয়ে গেছে।
মেয়ের কোনো কথায় অমত করেনা মীরা- রিনি বড় হয়েছে, যথেষ্ট বুদ্ধিমতী, ওর ওপর আস্থা রাখা যায়- জ্ঞান হওয়ার পর থেকে অমানবিক, অস্বাভাবিক নিষ্ঠুর সব ব্যাপার দেখে দেখে প্রচন্ড বাস্তববাদী হয়ে উঠেছে, কঠিন, কোমলে মেশানো আশ্চর্য ভালো একটি মেয়ে।
পড়াশোনাটা শেষ করলো না রিনি। আই. এ. পাশ করার পর সহসা মন পরিবর্তন করে বুটিকের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠলো। মীরা আর কি বলবে, রিনির কোনো ইচ্ছেতেই বাঁধা দেয়নি, শুধু বলেছে-
-যা করবি, ভেবে চিন্তে করিস, তোর ওপর আমার অনেক আশা, ভরসা।
মাকে আশ্বাস দিয়ে রিনি বলেছিলো-
-তুমি কিছু ভেবো না মা, আমি কোনো ভুল করবো না, তোমার স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করার যে চ্যালেঞ্জ আমি গ্রহন করেছি, সেটা কোনো না কোনো ভাবে সফল করে দেখাবো, তুমি শুধু দোয়া করো আমাকে।
এরপর রিনি বুটিকের ওপর সমগ্র মনোযোগ দিয়ে বিভিন্ন কোর্স সম্পন্ন করলো। পোশাক শিল্পকে ভালো ভাবে আয়ত্বে এনে অল্প পূঁজি নিয়ে বুটিকের দোকান দিলো- সেই ছোট দোকানই এখন বিশাল জমজমাট হয়ে বসুন্ধরা সিটিতে সাফল্যের সাথে স্থান করে নিয়েছে।
ড্রাইভারের ডাকে রিনি বর্তমানে ফিরে এলো। বাসায় পৌঁছে গেছে- সামান্য পথ কখন শেষ হয়েছে টের পায়নি।
রাতের খাওয়া সেরে বারান্দায় বসলো রিনি গরম কফির মগ নিয়ে- খাবার পর কফি খায় সে- অভ্যাস।
সংসার নিয়ে রিনিকে কোনো চিন্তা করতে হয় না, মধ্য বয়সী এক বিধবা মহিলা ওর সংসার আগলে রাখে। বেচারীর কোথাও কেউ নেই, রিনির দোকানের এক কর্মচারী ওকে যোগাড় করে দিয়েছিলো। রিনি তাকে খালা বলে ডাকে, আর সে রিনিকে আম্মু বলে- খালার অকৃত্রিম আন্তরিকতা ও সততার পরিচয় পেতে সময় লাগেনি, খালা এমন নিরাপদ আশ্রয় পেয়ে বেঁচে গিয়েছে আর রিনি হয়েছে নিশ্চিন্ত।
সারাদিন বাইরে কাজকর্ম করে এসে রান্না, ঘরদুয়ার পরিস্কার ইত্যাদি সাংসারিক কাজ করা কষ্টকরই হয়ে যেতো- রিনির দরকার ছিলো এমন একজন মুরুব্বী গোছের মানুষ, যে দরকারে কাজে সাহায্য করবে আবার ভালোবাসা দিয়ে ওর শূন্যতা পূর্ণ করবে- যদিও যা সে হারিয়েছে তা কোনো মতেই পূরণ হবার নয় তথাপি খালাকে আপনজন হিসাবেই দেখে রিনি।
কফিতে চুমুক দিচ্ছে রিনি- মহাশূন্যের নীলিমায় চেয়ে থেকে চাঁদ তারার ঝিলমিল সৌন্দর্য কিছুক্ষণ মন দিয়ে দেখলো তারপর আবার অন্যমনস্ক হয়ে গেলো- নিজেকে বড় নিঃসঙ্গ মনে হয় রিনির- মা যদি এসময় পাশে থাকতো তাহলে পরিপূর্ণ সার্থক হতো তার জীবন- রাজু মামাও চলে গেলো।
নিঃশব্দে চোখের পানি ঝরে পড়তে লাগলো, কত স্বপ্ন ছিলো ঐ দুজন প্রিয় মানুষকে নিয়ে অথচ কাউকেই ধরে রাখতে পারলো না রিনি, কোথায় কোন নক্ষত্রলোকে চিরতরে চলে গেলো রিনিকে একা রেখে।
নিশীথ নিঝুম রাতে রিনি একাকী বসে আছে বারান্দায়- স্মৃতির ডালা খুলে উদাস মনে হারিয়ে গেছে অতীতে- যে অতীত তাকে অহরহ কষ্ট দেয়- ভুলতে দেয় না প্রিয় দুজন মানুষের কথা।
মীরা- মা ওর মা- এমন নরম সরল সহজ মানুষ আর দেখেনি রিনি- স্বামীর শত অত্যাচার মুখ বুজে সয়ে গেছে, তবু ছেড়ে যেতে চায়নি কিন্তু প্রতারক স্বামী যখন দ্বিতীয় বিয়ে করে হেলায় ফেলে চলে গেছে তখন বাধ্য হয়ে নিরুপায় মা বিনা প্রতিবাদে সব দাবী, অধিকার ছেড়ে দিয়ে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে- জীবনের শেষ দিন পযর্ন্ত জানতেও পারেনি লোকটা কোথায় কেমন আছে,
রিনিও জানে না বাবার হদিস।
রাজু- যার সাথে কোনো রক্তের সম্পর্ক ছিলো না, কি পরম মমতায় জড়িয়ে রেখে ছিলো ওদের মা মেয়ে দুজনকে, কত উৎসাহ দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে সব দুঃখ কষ্ট ভুলিয়ে দেবার কি আন্তরিক প্রচেষ্টা ছিলো-
মায়ের স্বপ্নকে চূড়ান্ত সফলতার সাথে বাস্তবায়ন করেছে সে কিন্তু সেটা দেখে যেতে পারেনি মীরা, আর মামা তো অনেক আগেই চলে গেছে। দুজনের কেউই রিনির জয়ী হওয়া দেখতে পারেনি।
নিজের আয়ত্ব সমস্ত বিদ্যার সাহায্যে আর্কষণীয় ডিজাইন এবং উন্নতমানের উপাদান সামগ্রী দিয়ে ব্যবসার ভালো একটা অবস্থান তৈরী করতে সক্ষম হয় রিনি।
আজকের এই জায়গায় পৌঁছাতে ওকে কম পরিশ্রম করতে হয়নি, দিন রাত এক করে ফেলেছে সে ব্যবসাটা প্রতিষ্ঠিত করতে- প্রচন্ড ব্যস্ততায় কেটেছে ওর প্রতিটি মুহূর্ত, নাওয়া খাওয়ার সময় পযর্ন্ত পায়নি- কৃতকার্য হওয়ার সাধনায় মগ্ন থেকেছে।
মা কত সময় অভিযোগ করেছে- এইভাবে খাটলে যে অসুস্থ হয়ে যাবিরে মা, আমি তোকে কাছে পাচ্ছি না তেমন।
-মা, ধৈর্য্য ধরো- এই তো প্রায় গুছিয়ে এনেছি তারপর তোমাকে নিয়ে কত মজা করবো, ঘুরবো বেড়াবো।
সেই সময় আর পায়নি রিনি- ব্যস্ততার কারণে মায়ের অসুস্থতার কথা জানতে পারেনি- মা যে তিলে তিলে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে, সে টেরও পায়নি।
রিনিকে ঘুণাক্ষরেও বুঝতে দেয়নি মীরা নিজের শরীর খারাপের কথা, মেয়ে জানতে পারলে সব কাজ ফেলে তার কাছে বসে থাকবে- এটাই সে চায়নি। একেবারে যখন শয্যাশায়ী হয়ে পড়লো মীরা, তখন রিনি জানতে পারলো- ততদিনে ঘাতক- ব্যাধি ক্যান্সার পুরো গ্রাস করেছে মীরাকে।
ডাক্তারের সাধ্য ছিলো না আর কিছু করবার। মাকে আঁকড়ে ধরে অঝোরে কেঁদেছে রিনি-
-কেন মা কেন? আমাকে তোমার অসুস্থতার কথা জানতে দাওনি কেন? এখন আমি কি করবো মা? আমার যে কোথাও আর কেউ নেই- তুমি না থাকলে আমার সব কিছু যে অর্থহীন হয়ে যাবে মা।
মীরা ক্ষীণ হেসে সান্ত্বনা দেওয়ার বৃথা চেষ্টা করেছে মেয়েকে কিন্তু রিনি শান্ত হয়নি, অব্যক্ত যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে বলেছে-
-আমি যে বড় আশা করেছিলাম মা, তোমাকে নিয়ে এক স্বপ্নের জগত গড়ে তুলবো, নতুন করে বাঁচবো, সুন্দর স্বাভাবিক জীবন যাপন করবো কিন্তু- এখন কি হবে মা? আমি যে একদম একা হয়ে যাবো মাগো- না না তোমাকে আমি বিদেশে নিয়ে যাবো, ভালো ভাবে চিকিৎসা করলে নিশ্চয়ই তুমি সেরে উঠবে।
ব্যাকুল অশ্রুতে চোখ মুখ ভেসে যেতে থাকে রিনির। মীরার অন্তরেও কষ্টের ঢেউ উথালপাথাল করে, টলমল অশ্রু ঝরতে না দিয়ে বলেছে-
-পাগলী মা আমার, আমি কোথাও যাবো না, আমাকে এখানেই শান্তিতে থাকতে দে।
-না, তোমাকে এভাবে যেতে দেবো না, আমি আজই সব ব্যবস্থা করছি।
-তুই যে আমার বড় লক্ষ্মী মেয়ে, বুদ্ধিমতী সোনা মেয়ে, এভাবে ভেঙে পড়িস না মা, নিজেকে একা মনে করিস না, আল্লাহ্ আছেন তোর সাথে, তিনিই তোকে শক্তি, সাহস দেবেন- তাঁর রহমত, আমার দোয়া সবসময় থাকবে তোর সাথে।
মাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে কিন্তু ডাক্তাররা কোনো আশ্বাসবাণী শোনাতে পারলেন না, বিস্ময় প্রকাশ করলেন যে এই রোগ চেপে রেখে এতদিন যন্ত্রণা সহ্য করলেন কি ভাবে, এবং সময় বেশী নেই, সেটাও রিনিকে বলা হলো।
অশান্ত রিনি মায়ের বেডের পাশে বসে গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললো-
-মা গো, আমি কিচ্ছু ভাবতে পারছি না, কার ওপর অভিমান করে চলে যাচ্ছো মা?
-আমি কার ওপর অভিমান করবো রে? তুই ছাড়া আমার কে আছে? এটা আল্লাহরই ইচ্ছা ওনার হুকুমেই আমি চলে যাচ্ছি, আমার কোনো আফসোস নেই রে মা।
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো মীরা, শরীরের কষ্টে কথা বলতে পারছে না, টেনে টেনে নিঃশ্বাস নিতে লাগলো, মায়ের হাত মুঠোয় শক্ত করে ধরে রিনি স্তব্ধ হয়ে দেখলো- নিরুপায় সে- এই অসহনীয় ব্যথা দুর করার উপায় রিনি জানেনা।
বেশ অনেকক্ষণ পরে মীরা ইশারা করলো মেয়েকে তার আরো কাছে আসতে, রিনি প্রায় জড়িয়ে ধরে রাখল মাকে নিজের বুকের সাথে, ফিসফিস করে মীরা বললো- মা আমার কিছু ইচ্ছে আছে,
-তোমার কষ্ট হচ্ছে মা, এখন কথা বোলো না-
-সময় নেই, এখনি বলি- তোর কাছে কিছু চাইবো, আমার ইচ্ছেগুলো, আমার চাওয়া তুই- তুই পূরণ করবি?
-বলো মা বলো, কি তোমার ইচ্ছে কি করতে হবে আমাকে, আমি অবশ্যই পূরণ করবো।
ব্যাকুল স্বরে রিনি জিজ্ঞেস করলো, নিজেকে স্বাভাবিক রাখতে খুব কষ্ট হচ্ছে। এরপর মীরা থেমে খুব আস্তে বলেছিলো কিছু কথা- আর পাথর হয়ে রিনি শুনেছিলো মায়ের অন্তিম ইচ্ছেগুলো।
হাহাকারে বুক ভেঙে গেলেও- মৃতপথযাত্রীনিকে কথা দিয়েছিলো রিনি- মায়ের শেষ চাওয়ার সম্মান রাখবে সে।
নিশ্চিন্তে মীরা চুপ করে চোখ বন্ধ করেছিলো- এটুকু কথা বলতেই দম প্রায় ফুরিয়ে গিয়েছিলো- নিজের মেয়েকে চেনে মীরা- দুনিয়া উল্টে গেলেও ওর কথার নড়চড় হবে না।
জীবনে কিছু পায়নি মা, অনেক চেষ্টা করেও স্বামীর মন পায়নি- অবশেষে দুঃসহ যন্ত্রণা সয়ে তিলে তিলে শেষ হয়ে গেলো মা।
অন্তরে ঝড়ের আলোড়ন চেপে প্রতিজ্ঞা করেছিলো রিনি- মায়ের কথা রাখবে।
সেদিনই ফজরের একটু আগে মেয়ের হাতের ওপর মাথা রেখে চিরতরে বিদায় নিয়েছিলো মীরা- সব যন্ত্রণার অবসান, নিষ্ঠুর পৃথিবী তাকে দয়া করেনি।
মাথার ওপর কার হাতের স্পর্শে চমকে উঠলো রিনি- কখন খালা এসে পাশে দাঁড়িয়েছে টের পায়নি রিনি- সস্নেহে খালা মৃদু স্বরে বলে-
-আম্মু অনেক রাত হইছে, ঘুমাও অহন, নাইলে শরীল খারাপ হইবো।
আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না রিনি, খালার বুকে মাথা রেখে ঝরঝর করে কেঁদে ফেললো- খালা রাজুর কথা জানে আর মীরার জীবন কাহিনী না জানলেও, মা হারা এই মেয়েটির প্রতি মমতায় বুক ভরে থাকে, সান্ত্বনা দিতে যেয়ে নিজেও কেঁদে ফেললো।
নিশাচর পাখি নিঝুম চরাচর সচকিত করে ডেকে উঠলো।
খালাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে কিছুটা হালকা হলো রিনি- ঘরে এনে যত্ন করে বিছানায় শুইয়ে দিলো খালা, সে রিনির ঘরেই ঘুমায়, আলাদা বিছানায়,
সহ্নদয় খালা মেয়েটাকে একা শুতে দিতে চায়নি।
ঠান্ডা পানি পান করিয়ে রিনিকে শান্ত হয়ে শুতে বলে খালা ঘুমিয়ে গেলো।
রিনির ঘুম এলো না- বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করতে লাগলো, আগামীকাল কত কাজ পড়ে আছে, ভালো ঘুম না হলে সারাদিন শরীর খারাপ লাগবে, কাজেও মন বসাতে পারবে না- আবার মনের পর্দায় ছায়াছবির মত ভেসে উঠলো ফেলে আসা দিনের স্মৃতি-
সংসার- সমুদ্রে একাকী দুই নয়নের মণি, কলিজার টুকরো রিনিকে রেখে চিরতরে মীরা হারিয়ে গেলো নক্ষত্রলোকে।
একদিকে কঠিন বাস্তব- নিজের অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধ, অপরদিকে মাকে হারানোর তীব্র বেদনা।
রিনি দুর্বল মানসিকতার মেয়ে নয় কিন্তু কিছুটা হলেও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলো। যতই শক্ত মনের মানুষ হোক- ছোটবেলা থেকে তিক্ততার মধ্যে থেকে বেড়ে ওঠা ও প্রিয় মামার বিয়োগ ব্যথা শেষে মা’র বেদনাদায়ক মৃত্যু- সব কিছু মিলিয়ে রিনিকে একদম বিধ্বস্ত করে দিয়েছিলো- আল্লাহর অপার রহমত, ঠিক সেই সময় রিনির কলেজের বান্ধবী আলোর সাথে দেখা হয়ে যায়।
যতই কষ্ট হোক, যেটা শুরু করেছে সেটা তো চালিয়ে যেতেই হবে- তাই একদিন বুকে একরাশ বেদনা নিয়ে রিনি চাঁদনী চকের থান কাপড়ের দোকানে এলো কাপড় কিনতে, নিজের দোকানের পোশাকের জন্য কাপড় বাছাই করবে- ডিজাইন ওরই, কাপড়ও পছন্দ করে সে শুধু দরজি ফরমায়েশ মত সেলাই করে দেয়- মন দিয়ে কাপড় দেখছিলো রিনি, এমন সময় কে যেন ওর লম্বা বেণী ধরে এক টান দিলো।
সবেগে ঘুরে রেগে কিছু বলতে গেলো রিনি কিন্তু মুখের দিকে তাকিয়ে থমকে গেলো- ওরই বয়সী সুন্দর একটি মেয়ে ওর দিকে চেয়ে মিটিমিটি হাসছে।
-কিরে কেশবতী কন্যা চিনতে পারলি?
সঙ্গে সঙ্গে চিনলো রিনি, কলেজের প্রিয় বান্ধবী- আলো- রিনির চমৎকার চুলের জন্য সবাই ওকে এই নামে ডাকতো। সবিস্ময়ে বলে উঠলো-
-আলো!
-না, আলোর ভুত, আমি তো তোর চুল দেখেই চিনেছি, আর তুই চিনতে দেরী করলি?
আলোর কন্ঠে অভিমানী সুর, উচ্ছ্বসিত রিনি সব ভুলে আলোকে জড়িয়ে ধরে হাসিমুখে বললো-
-আর তুই ঠিক আগের মত, কথায় কথায় অভিমান-
-তোর কাজ শেষ হয়ে থাকলে চল কোথাও বসে আড্ডা মারি, কত কথা আছে বলার, কত কথা আছে শোনার।
-কাজ শেষ হয়নি, সে পরে করা যাবে, এতদিন পরে দেখা হলো, ছাড়াছাড়ি নেই, চল কাছেই একটা ভালো কফি শপ আছে, সেখানে বসে কথা বলবো।
দুই বান্ধবী শপে যেয়ে হালকা খাবার ও কফি নিয়ে বসলো। কিছু টুকটাক কথার পর আলোর প্রশ্নÑ
-রিনি তোর মুখ দেখে কেমন যেন মনে হচ্ছে, কি হয়েছে, আপত্তি না থাকলে আমাকে খুলে বলবি?
মুখ মনের আয়না, প্রভাব পড়েছে চেহারায়, কিছু সময় চুপ করে থেকে রিনি বললো-
-আপত্তি নেই, বলবো কিন্তু সময় লাগবে, তোর কি সময় হবে শোনার?
-আমি সময় কাটাবো কি করে ভাবছি, আর তোর সাথে দেখা হয়ে গেলো, এক কাজ করি, এখানে নয়, চল আমার বাসায়, মনের সুখে দুই বান্ধবী কথা বলবো।
আলোর সাথে গাড়ি ছিলো- যেতে যেতে রিনি ওর বিষয়ে জানলো- আলোর স্বামী জুয়েল ব্যবসায়ী, খুবই কোমল ভদ্র একটি মানুষ, শ্বশুর নেই, শাশুড়ি আছেন, থাকেন দেশে, শহরের কোলাহল ওনার ভালো লাগে না, গ্রামেই উনি স্বচ্ছন্দ, মাঝে মাঝে এসে থাকেন কদিন- আলোর ফ্ল্যাট লালমাটিয়ায়, স্বামী স্ত্রীর সংসার, কোনো বাড়তি ঝামেলা নেই।
আলোর বাসায় এসে ভালো লাগলো রিনির, ছিমছাম সাজানো ঘর- তখনই কিছু শুনতে চাইলো না আলো- দুপুরে খাওয়া সেরে বিছানায় শুলো দুজন- নিস্তব্ধ মধ্যাহ্নে রিনির কাহিনী শুনলো আলো- সমবেদনায় মনটা ভরে গেলো।
সেদিন আর আলো রিনিকে ছাড়লো না, রাতে জুয়েলের সাথে পরিচয় হলো- গল্পগুজব আড্ডায় সুন্দর সময় কাটলো ওদের।
আলোদের আন্তরিক সহানুভূতি রিনি মনের অবসাদ, নিঃসঙ্গতা সব কাটিয়ে উঠে ব্যবসায় মনপ্রাণ ঢেলে দিল, জুয়েল ওকে যথেষ্ট সাহায্য করলো। রিনি নিঃস্বার্থ দরদী এই দম্পতির কাছে খুবই কৃতজ্ঞ, বড় দুঃসময়ে এদের পাশে পেয়েছিলো। সব দ্বিধা বাঁধা দুর করে রিনি নিজের পায়ের মাটি মজবুত করে ফেললো।
আলো দেখতে যেমন সুন্দর তেমনি খুব প্রাণবন্ত আমুদে একটি মেয়ে- আনন্দ, হৈচৈ করে মাতিয়ে রাখে- অফুরন্ত প্রাণ শক্তি- রিনি যেমন সংযত গম্ভীর- আলো তেমনি চঞ্চল উচ্ছল- জুয়েল ও কম যায়না, দুজনের জুটি মিলেছে ভালো।
সব সময় আনন্দে মেতে থাকে- ওর পরিস্কার কথা- মানুষের জীবনে সমস্যা দুঃখ কষ্ট থাকবেই, তাই বলে দিন রাত দুশ্চিন্তা করে দেহ মন কাহিল করে ফেলতে হবে নাকি? যে কদিন বাঁচবে মনের শান্তি ও আনন্দ নিয়ে দিন কাটাও।
আলোদের পাল্লায় পড়ে ভারতের অনেক জায়গা বেড়িয়েছে- দেশেও ঘুরেছে- চমৎকার সব স্থানে ওরা তিনজন ঘুরে বেড়িয়ে দারুণ উপভোগ করেছে। অস্বীকার করতে পারবে না রিনি- খুবই ভালো লেগেছে- মনের সব কষ্ট, বেদনা- শরীরের জড়তা ক্লান্তি সহজেই দুর হয়েছে।
দোকানে কাজ করার সময় কত দিন আলো জবরদস্তি করে টেনে বের করেছে রিনিকে- কখনো চাইনীজ, কখনো বা থিয়েটার- কখনো দুরে কোথাও বৃষ্টি মুখর রাতে গাড়িতে ঘুরেছে।
যেমন আলো তেমনি জুয়েল- দুটোরই মাথা নষ্ট, নিত্য নতুন পরিকল্পনা করে- রিনির রেহাই নেই, ওদের সঙ্গে যেতেই হবে।
যাইহোক- নিঃসঙ্গতা আর তেমন করে অনুভব করে না রিনি- ওর জীবন আশা ভরসার আলোয় আলোকিত হয়ে উঠেছে এই দুজন অসামান্য মানুষের আগমনে।
চলবে-