আবিদ চৌধুরী- প্রতাপশালী দুর্দান্ত অত্যাচারী পুরুষ- তার বাবা সামনে দাঁড়িয়ে।
স্তম্ভিত রিনি নির্বাক চেয়ে রইলো- বাবাকে চিনতে তার এতটুকু দেরী হয়নি কিন্তু- কিন্তু এই কি আবিদ চৌধুরী!
লম্বা চওড়া সুদর্শন জাঁদরেল এক পুরুষ- তার বদলে ইনি কে দাঁড়িয়ে তার সামনে!
চেহারা স্বাস্থ্য নষ্ট হয়ে গেছে, লম্বা শরীর কিছুটা নুয়ে পড়েছে- মাথায় যেটুকু চুল আছে, সাদা হয়ে গেছে- হিসাব মত বাবার বয়স এখন সাতচল্লিশ বা আটচল্লিশ হবে, অথচ দেখাচ্ছে আশি বছরের বুড়োর মত।
পরনে ময়লা বির্বণ শার্ট প্যান্ট- সেই শৌখিন সর্বদা ফিটফাট পরিচ্ছন্ন থাকা আবিদ চৌধুরীর প্রেতাত্মা যেন, এই হত দরিদ্র বুড়ো মানুষটিকে কি রিনি চেনে!
সজাগ হয়ে নিজেকে সামলে রিনি ম্যানেজারকে বললো- ঠিক আছে আপনি যান, আমি কথা বলছি।
কোনো মায়া দয়া নয়- এর জন্য মা একদিনের জন্যও শান্তি পাননি, তিলে তিলে নিঃশেষ হয়ে অকালে চলে যেতে হয়েছে পৃথিবী থেকে।
মেয়ে চিনেছে তার বাপকে কিন্তু বাপ চেনেনি তার সন্তানকে, সেই কিশোরী কন্যা আজ রূপসী তরুণীতে পরিণত হয়েছে, তাই হয়তো চিনতে অসুবিধা হচ্ছে- দুজন দুজনের দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।
আবিদ চৌধুরীই আগে নীরবতা ভঙ্গ করলো, হাতের খবরের কাগজটা দেখিয়ে প্রশ্ন করলো-
-একটা বিজ্ঞাপন দেখে এসেছি, আমি আবিদ চৌধুরী, যদি আমার জন্যই বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়- অবশ্য বুঝতে পারছি না কেন-
খুব নরম নিস্তেজ স্বর তার, এমন বিষন্ন নীচু সুরে কি আবিদ কখনো কথা বলেছে? সব সময় দাপটের সাথে উচ্চ স্বর বের হতো তার গলা দিয়ে।
শান্ত শীতল কন্ঠে রিনি বললো- আপনাকেই দরকার।
আবিদ খুব অবাক হলো, তাকে কেন দরকার! কে মেয়েটি, কোথায় দেখেছে! খুব চেনা চেনা লাগছে কিন্তু কিছুই মনে পড়লো না।
কতকাল পরে দেখা, রিনির অন্তরে তোলপাড় হচ্ছে যে মানুষটাকে শুধু ঘৃণা করেই এসেছে, এখন তার মুখোমুখি হয়ে আশ্চর্য- কোন রাগ, বিদ্বেষ তো সে অনুভব করছে না- রক্তের টান নাকি নির্জীব অসহায় মানুষকে দেখে রিনি বিচলিত বোধ করছে?
না কিছুতেই একে দরদ দেখানো চলবে না- এর ওপর কোনো টান, মায়া, মমতা থাকতে পারে না, সম্ভবই নয়, মনের আবেগকে কঠোর ভাবে দমন করলো রিনি, আবারও প্রশ্ন করলো আবিদ-
-বিজ্ঞাপনটা কি আপনিই দিয়েছেন? এতে শুধু দোকানের ঠিকানা দিয়ে মালিকের সাথে দেখা করতে বলা হয়েছে, কারো নাম তো নেই।
রিনি গম্ভীর হয়ে জানালো সেই দিয়েছে বিজ্ঞাপন, তারপর ম্যানেজারকে ডেকে বললো- আমি যাচ্ছি, দরকার হলে ফোন দেবেন, আজ হয়তো আসবো না।
আবিদকে নিয়ে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এলো রিনি, কর্মচারীদের সামনে বেশীক্ষণ থাকা বা কোনো কথা বলা উচিত নয়।
লিফটের সামনে দাঁড়িয়ে হঠাৎ থেমে গেলো রিনি তারপর ঘুরে আবিদকে জিজ্ঞেস করলো-
-আপনার খাওয়া হয়েছে?
কেন একথা বললো সে নিজেই জানে না, হকচকিয়ে আবিদ আমতা আমতা করলেন- না মানে- দুপুরে দেরী করে খাই।
যা বোঝার বুঝে নিলো রিনি, বুকের মধ্যে সহসা মোচড় দিয়ে উঠলো, এতটাই করুণ অবস্থা হয়েছে মানুষটার যে খাওয়ারও ঠিক নেই!
-আসুন আমার সাথে।
বিস্মিত আবিদকে নিয়ে আট তলায় ফুড কোর্টে নিয়ে চেয়ারে বসিয়ে কাউন্টারে গেলো খাবার আনতে, তারপর খেয়াল হতেই ফোন করলো আলোকে- ধীর স্বরে বললো- আলো আবিদ চৌধুরীকে পেয়েছি, হ্যাঁ, বিজ্ঞাপন দেখেই এসেছেন, না কোনো কথা হয়নি, আমাকে চিনতে পারেনি- বাসায় নিয়ে যাচ্ছি- না না তোর এখন আসার দরকার নেই, আমি পরে তোকে জানাবো আর শোন চাচাকে খবরটা দিস, রাখি এখন।
রকমারী খাবার এনেছে রিনি, আবিদের মুখোমুখি বসে ভাবলেশহীন মুখে বললো- খেতে শুরু করুন।
একটু ইতস্তত করতে লাগলেন আবিদ, মেয়েটাকে তো চিনতে পারছেন না, আবার তার আনা খাবার খেতে হবে-
-আপনি খাবেন না?
-না, আমাকে আপনি করে বলবেন না।
-ঠিক আছে, কিন্তু আমাকে কি দরকার- !
-আগে খেয়ে নিন, সময় মত সবই জানতে পারবেন।
মেয়েটির কন্ঠস্বরে প্রচ্ছন্ন আদেশ ও কতৃত্বের সুর।
আর কিছু না বলে খেতে লাগলেন আবিদ। খাওয়ার নমুনা দেখেই বোঝা গেলো, এমন সুস্বাদু খাবার তো দুরের কথা- বোধহয় পেট ভরে সবদিন খেতেও পাননি।
কঠিন হতে চেয়েছিলো রিনি কিন্তু পারছেনা, ভিতরটা দুমড়ে মুচড়ে যেতে লাগলো।
মায়ের কথা মনে পড়লো, রিনির প্রশ্নের জবাবে মা একদিন বলেছিলেন- তোর বাবার সব অত্যাচার আমি সহ্য করেছি কারণ তাকে যে আমি ভালোবেসেছি, আমার কুমারী হ্নদয়ের প্রথম ভালোবাসা, প্রথম পুরুষ, মেয়েরা বারবার ভালোবাসে না, একজনকেই দেহমন দিয়ে ধন্য হয়।
নিজেকে কেমন জানি অসহায় মনে হচ্ছে রিনির, এই মানুষটার সাথে সেই অত্যাচারী নিষ্ঠুর মানুষের মিল কোথায়? এতো জীর্ণশীর্ণ নিঃস্ব কেমন করে হলো! অর্থের অভাব তো এর হওয়ার কথা নয়, কিভাবে এই অবস্থা হলো!
রিনি কিছুটা দিশেহারা বোধ করলো, একবার ভাবলো আলোকে ডাকবে- না থাক নিজের ঝামেলা নিজেকেই সামলাতে হবে।
খাওয়া শেষ হতে রিনি জিজ্ঞেস করলো- আর কিছু খাবেন?
মাথা নাড়লেন আবিদ লিফটের কাছে এসে রিনি ড্রাইভারকে ফোনে গাড়িটা গেটের কাছে নিয়ে আসতে বলে দিলো।
আবিদ গাড়িতে বসে ভেবেই চলেছেন- মেয়েটি কে? এত যত্ন করে খাওয়ালো আবার এখন কোথায় চলেছে, কি প্রয়োজন, কি উদ্দেশ্য!
বাসায় এসে আবিদকে ড্রয়িং রুমে বসতে বলে রিনি মীরার ঘরে এলো তারপর মায়ের ছবির দিকে তাকিয়ে ঝরঝর করে কেঁদে ফেললো-
-মা, মাগো, কি করবো আমি এখন মা? আমি যে ভয়াবহ পাষন্ড একজন মানুষের মুখোমুখি হবো ভেবেছিলাম, এই মানুষটি যে বড়ই অসহায়- দুর্বল একজন মানুষের সাথে আমি কিভাবে কঠিন ব্যবহার করবো? তোমার প্রতি অন্যায়ের কৈফিয়ত চাইবো?
বেশ কিছুক্ষণ কান্নাকাটি করে হালকা হলো রিনি, তারপর ভালো করে হাতমুখ ধুয়ে নিজেকে শক্ত করে আলমারি খুলে দুটো বড় খাম আর একটা চাবির গোছা নিয়ে ড্রয়িংরুমে এলো।
আবিদ মূর্তির মত বসেছিলেন, বিস্ময়, কৌতূহলে বিহবল হয়ে চারদিক দেখতে দেখতে ভাবছিলেন এত সুন্দর সাজানো ঘর- ঐ মেয়েটিরই কি? কে এই মেয়ে!
রিনি এসে ডাকলো- আসুন আমার সাথে-
মীরার বেডরুমে আবিদকে নিয়ে এসে সরে দাঁড়ালো রিনি একপাশে- বিরাট রঙিন ছবির দিকে চেয়েই আবিদ বজ্রাহতের মত দাঁড়িয়ে পড়লেন, গায়ে যেন কেউ গলিত লাভা ঢেলে দিয়েছে, অসংখ্য বিষাক্ত সাপ যেন ছোবল দিয়েছে তাঁকে-
ছটফট করে উঠে আর্তস্বরে আর্তনাদ করে উঠলেন
-মী- রা!মীরা!
-হ্যাঁ, আমার মা আর আমি রিনি- মনে করতে পারছেন কিছু?
ঠান্ডা শীতল কন্ঠ রিনির। বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে থেকে উচ্চারণ করলেন আবিদ- রিনি! রিনি!
অবসন্ন আবিদ আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না, বুকে হাত চেপে খাটের ওপর বসে পড়লেন- দুচোখ বেয়ে স্রোতের মত পানি বের হচ্ছে। আহত পশুর গোঙানী বেরিয়ে এলো তার-
-রিনি, আমার মেয়ে! তুই রিনি, সেই ছোট্ট রিনি!
হাহাকার করে উঠলেন আবিদ- দারুণ অবাক হলো রিনি- কাঁদছে লোকটা! অনুতাপের অশ্রু! যদি হয়েও থাকে, রিনির তাতে কিছু যায় আসে না অনেক দেরী হয়ে গেছে, আবিদ চৌধুরীর প্রতি কোনো মায়া মমতা অবশিষ্ট নেই রিনির।
কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলো রিনি তারপর বললো-
-কান্নাকাটি করবেন না, লাভ কি এতে? আমার কিছু কথা বলার ছিলো, সেই জন্যই খুঁজেছি আপনাকে- কথাগুলো ঠিক আমার নয়, আমার মায়ের, তাঁর অন্তিম সময়ে বলা কিছু ইচ্ছে আমি পূরণ করবো বলে কথা দিয়েছিলাম।
নিদারণ ভাবে কেঁপে উঠে আর্তনাদ করে উঠলেন,
-মীরা- মীরা নেই?
আর কিছু বলতে পারলেন না, দুই নয়ন বেয়ে অঝোরে অশ্রু ঝরে পড়ছে।
-না, মা নেই, ক্যান্সার হয়েছিলো- চার বছর আগেই মারা যান।
অবুঝ শিশুর মত কাঁদতে লাগলেন একদার ভয়াল নিষ্ঠুর মানুষটা।
কত কথা মনে পড়ছে আবিদ চৌধুরীর- নির্দোষ স্ত্রীর সাথে অকারণে জঘন্যতম দুর্ব্যবহার করেছেন,
আপন সন্তানকেও রেহাই দেননি, আদর করে কোলে নেননি- বাবার স্নেহ ভালোবাসা পেতে কাছে আসা শিশুকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়েছেন, সামান্য ছুতোয় মেরেছেনও- সেই মেয়ে রিনি?
অসহায় অবস্থায় ফেলে রেখে স্বার্থপরের মত সরে যেয়ে আর কোনো খোঁজ রাখেননি- আজ চূড়ান্ত সাফল্য অর্জন করেছে- তার সেই অবহেলিত মেয়ে।
সামনে বসিয়ে পাষাণ, জল্লাদ বাপকে পেট ভরিয়ে খাওয়ালো- তারই মেয়ে। তিনি চিনতে পারেননি কিন্তু মেয়ে তাকে চিনেছিলো, বুঝেছিলো বাপ তার ক্ষুধার্ত।
কিভাবে তিনি আজ এই মেয়েকে বলবেন যে দীর্ঘ কতগুলো বছর অনুশোচনার আগুনে জ্বলে পুড়ে শেষ হয়েছেন- সুদীর্ঘ দিনগুলোর অসহনীয় কষ্টকে যদি প্রায়শ্চিত্ত বলা যায় তাহলে সেটা তিনি করেছেন, বিবেকের দংশনে জর্জরিত হয়েছেন কিন্তু তাও স্ত্রী কন্যার সামনে যেয়ে দাঁড়াবার সাহস তার হয়নি।
কতদিন ভেবেছেন মীরার কাছে চলে যাবেন, মাফ চাইবেন- পারেননি, আজ অনেক দেরী হয়ে গেছে , সব কিছুর উর্ধ্বে চলে গেছে মীরা- এমন স্ত্রীকে চিনতে তার ভুল হয়েছিলো- হীরা ফেলে কাঁচ বেছে নেওয়ার সাজা তিনি ভোগ করেছেন।
আজ মেয়ের দিকে চোখ তুলে তাকাতে লজ্জা হচ্ছে- রিনি তার উপলদ্ধি, অনুভূতি বুঝলো না শুধু এটুকুই বুঝলো যে আগের সেই দাপটের অত্যাচারি আবিদ চৌধুরী বদলে গেছে।
এখন যাকে দেখছে, তিনি নিঃস্ব, রিক্ত- সর্বহারা একজন পরাজিত মানুষ- মীরার ছিলো রিনি কিন্তু তার কে আছে, রিনি জানে না। রিনি ওনার জন্য বিন্দুমাত্র মমতা অনুভব করলো না- এই মানুষটিকে এখন করুণা করা যায়- মায়া দয়া নয়।
ভাবলেশহীন, নির্বিকারভাবে রিনি বললো-
-মৃত্যু শয্যায় মা আমাকে বলে গেছেন- আপনাকে তিনি ক্ষমা করেছেন এবং যে ফ্ল্যাটটা আপনি দয়া করে আমাদের দিয়েছিলেন, সেটা মা আপনাকে ফিরিয়ে দিতে বলেছেন, আল্লাহর অসীম রহমতে এবং মায়ের দোয়ায় আজ আমার অভাব কিছুর নেই, অনেক আগেই ওই ফ্ল্যাট থেকে আমি চলে এসেছি, খালি না রেখে ভাড়া দিয়েছিলাম, প্রতি মাসের ভাড়ার টাকা ব্যাঙ্কে আপনার নামে জমা হচ্ছে, ভাড়াটেদের বলা আছে স্বল্প নোটিশে যে কোনো সময়ে ফ্ল্যাটটা খালি করে দেবে।
কথাগুলো শুনে স্তম্ভিত হয়ে চেয়ে রইলেন তিনি, অবাক হবার ক্ষমতাও আর তার নেই।
খাম ও চাবি এগিয়ে দিয়ে বললো রিনি- খামের মধ্যে ব্যাঙ্কের পাশবই ও চেকবই আছে আর ফ্ল্যাটের দলিল, আমি ভালো উকিল দিয়ে সব ব্যবস্থা করিয়েছি, অসুবিধা হবে না, তারপরও যদি দরকার হয় আমাকে জানাবেন- আর এগুলো ফ্ল্যাটের চাবি।
পাথরের মত বসে রইলেন, ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে দেখছেন মেয়েকে, এত কথা শুনলেন কিন্তু বোধগম্য হলো কিনা কে জানে! নিজের মেয়ে অথচ কি অচেনা- ওগুলো নিতে হাত বাড়ালেন না।
কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে রুক্ষ্ম স্বরে রিনি বললো-
-দীর্ঘ দিন আমি এই বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছি, দয়া করে এগুলো নিয়ে আমাকে মুক্তি দিন।
খাম ও চাবি সেন্টার টেবিলে নামিয়ে রেখে রিনি ড্রাইভারকে ফোনে নির্দেশ দিলো যে সাহেব যেখানে বলবেন, সেখানেই যেন নামিয়ে দেয়।
-ড্রাইভারকে বলে দিয়েছি আপনাকে পৌঁছে দেবে।
-রিনি মা শোন, তুই এতক্ষণ বলেছিস আমি শুনেছি, আমারও কিছু বলার ছিলো।
-আপনার বলার থাকলেও, আমি কিছু শুনতে চাই না,
-তোর মা ফাঁকি দিয়ে চলে গেলো, অপরাধী হয়ে রইলাম, মাফ চাওয়া হলো না, তুইও আমাকে কোনো সুযোগ দিলি না, ঠিক আছে আমি যাচ্ছি।
রিনি চলে যেতে নিয়েও ঘুরে দাঁড়িয়ে বললো-
-একটু অপেক্ষা করুন, আমি আসছি।
একটু পরেই এসে রিনি দেখে, খালা শরবত বানিয়ে এনেছে, সেতো জেনেছে এই মানুষটা কে-
খুবই সংকোচের সাথে খালা বললো- ভাইসাব এতক্ষণ আইছেন, গরমে ঠান্ডা খাইতে ভালাই লাগবো, খান ভাইসাব খাইয়া লন।
-ধন্যবাদ, আমি এখন কিছু খাবো না, মা আসি তাহলে?
-বসুন, শরবত খেয়ে নিন, যত্ন করে দিয়েছে একজন, মানা করবেন না, আর এটা রাখুন, কিছু টাকা আছে, দুদিন ব্যাঙ্ক বন্ধ, টাকা তুলতে পারবেন না, যা দরকার হয় খরচ করবেন।
রিনি একটা খাম এগিয়ে দিলো। আবিদ চৌধুরী এবার হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন-
-তোর এই অপদার্থ বাপকে আর কত দয়া করবি?
এক রকম ছুটেই বেরিয়ে গেলেন তিনি, পিছনে পড়ে রইলো রিনির দেয়া সব কিছু, খালি হাতে এসেছিলেন- খালি হাতেই চলে গেলেন- কিচ্ছু নেননি, তিনিও আবিদ চৌধুরী।
জাঁদরেল পুরুষের গোঁ যেন আবার দেখতে পেলো রিনি- চট করে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো, সব কিছু দ্রুত হাতে নিয়ে খালাকে বললো- আমি ওনাকে পৌঁছে দিয়ে আসি খালা, তুমি দরজা বন্ধ করো।
সেও একরকম ছুটেই বেরিয়ে গেলো আবিদ চৌধুরীর পেছন পেছন।
দোকানে যায়নি আজ রিনি, ফোনেই ম্যানেজারের সাথে জরুরী কথা সেরে নিয়েছে। আলোদের দুপুরে খেতে বলেছে, খালা মহা উৎসাহে রান্নায় ব্যস্ত- মোরগ পোলাও, আস্ত ইলিশের রোষ্ট, টিকিয়া, খাসীর রেজালা, সালাদ- পুডিং গত রাতেই বানিয়েছে রিনি- খালা চমৎকার রান্না করে- সব রিনি শিখিয়েছে, রিনি শিখেছে মায়ের কাছে।
বিছানায় দুই বান্ধবী শুয়ে কথা বলছে- রিনি সব ঘটনা খুলে বলার পর আলো জানতে চাইলো- খালুকে পৌঁছে দিয়েছিলি, তারপর?
বিষন্ন কন্ঠে বলে রিনি- না গেলেই বোধহয় ভালো হোতো, রামপুরার এক ঘিঞ্জি বস্তির ঘরে থাকেন, অন্যান্য মানুষ থাকায় গাড়িতে উঠতে বিশেষ আপত্তি করেননি কিন্তু বস্তির বাইরে নেমে যেতে চাইলেন, আমি কি ছাড়ার মানুষ? জোর করেই দেখে এসেছি কোন নরকে এই জালিম মানুষটার স্থান হয়েছে।
আলো স্তব্ধ হয়ে শুনছিলো, কোনো মতে বললো-
-আর যেগুলো তুই দিয়েছিলি, সেগুলো তো নেননি।
-আমি যাওয়ার সময় সবই নিয়েছিলাম, নিতে চাননি- বললাম যে আমি যা কিছু করেছি বা করছি সব আমার মায়ের কথা মনে করে, তাঁর আত্মার শান্তির জন্য, আপনাকেও এটা মনে রাখতে হবে, এই বলে ওনার হাতে সব ধরিয়ে দিয়ে চলে এসেছি।
-বেশ করেছিস, ঐ জায়গায় খালুকে রেখে তুই চলে আসতে পারলি?
-কি করবো? কাঁধে তুলে নাচবো?
-রিনি তুই এত বুদ্ধিমতি, তোর রাগ থাকতে পারে তাই বলে তোর মন তো ছোট নয়, আমি তোকে চিনি বলেই বলছি, খালুকে ঐ জঘণ্য জায়গায় ফেলে রেখে তুই এই আরাম বিলাসিতার মধ্যে থাকতে পারবি?
-আমার মাকে কষ্ট দিয়েছেন, অবিচার করেছিলেন তার সাথে কোনো আপোষ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
-খালুর অবস্থার কথা জেনে, সব দেখেও এই কথা বলতে পারলি! অনুতপ্ত একটা মানুষকে ক্ষমা করাই মনুষ্যত্ব, তাছাড়া খালাম্মা কি শান্তি পাবেন?
রিনি আর পারলো না, কেঁদে ফেললো- আলো সস্নেহে ওকে জড়িয়ে ধরে কোমল সুরে বললো-
-আর জিদ করিস না, খালুকে তোর কাছে নিয়ে আয়, খালাম্মা খুশী হবেন।
রিনি কিছু বললো না, মনের মধ্যে জোরালো তুফানের তান্ডব চলতে লাগলো- তার মায়ের সন্তষ্টির জন্য সে সব করতে পারে, তবে কিছু সময় তার দরকার- আবিদ চৌধুরীর ব্যাপারে সহজেই কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া সময় সাপেক্ষ।।
এরপর ওরা দুজনই চুপ করে থাকলো, আলো খুব ধীরে বললো- তারপর?
-তারপর আবার কি? মাকে দেওয়া শপথ পূরণ করেছি- এই তো।
-আর একটা ইচ্ছাও ওনার আছে বলেই জানি।
-মা আমাকে বিয়ে করতে বলেছিলেন কিন্তু আজো আমি পুরুষের প্রতি সেরকম আকর্ষণ অনুভব করি না, বিয়ের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে সময় প্রয়োজন।
তিক্ত সুরে আলো বলে- হ্যাঁ, সময় নিতে নিতে বুড়ি হয়ে যাও, কে বিয়ে করবে তখন তোমাকে? সত্তর বছরের বুড়োও বিয়ে করতে হলে ছুকরী খোঁজে, আমার ভাইই তো তোমাকে তখন ঘুরেও দেখবে না।
হাসতে হাসতে বলে রিনি- আমি তাহলে বেঁচে যাবো, সত্যি আলো তোর ভাইকে বল ভালো দেখে মেয়ে পছন্দ করে বিয়ে করে নিতে।
-কথাটা কি মন থেকে বললি? ভাই তোর জন্য কেমন পাগল, তুই জানিস না? পারলি বলতে!
-দুর বাদ দে এই প্যাচাল, চাচা কি বললেন শুনে ?
-চাচাও ঐ কথাই বলেছেন- খালুকে তোর কাছে নিয়ে আসতে-
একটু গম্ভীর হয়ে গেলো রিনি, পরক্ষণেই বললো-
-দুটো তো প্রায় বাজে, জুয়েল এখনো এলো না,খাবি কখন? ফোন দে, আমি দেখে আসি খালার কত দুর।
আলো কতক্ষণ পরে রান্না ঘরে এসে দেখে রিনি পরিপাটি করে টিফিন বক্সে খাবার তুলছে।
-জুয়েল এখন আসতে পারবে না, কি কাজ পরে গেছে, রাতে আসবে, কিন্তু এসব কি ব্যাপার! খাবার- ও আচ্ছা বুঝলাম, আরে বান্ধবী বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না? খালুর জন্য তাই না? আলো হাসলো,
রিনি কিছু বললো না, নীরবে খাবার গুছাতে লাগলো।
ড্রাইভারকে দিয়ে খাবার পাঠিয়ে দিয়ে ওরা খেয়ে নিলো, রিনি অসন্তষ্ট হয়ে বললো- জুয়েলের এটা ঠিক হলো না, একসঙ্গে খাবো, তা নয়, বসে থাকো রাতের অপেক্ষায়।
দুই বান্ধবী গল্প করতে লাগলো, ইতিমধ্যে ড্রাইভার
এসে জানালো খাবার দিয়ে এসেছে। রিনির তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলা আলোর চোখ এড়ালো না, সে মৃদু হাসলো।
রাত তখন আটটা- কলিং বেল বাজলো, খালার দরজা খোলার সাথে তার কলরব ভেসে এলো-
-ওমা বাজান আইসা পড়ছে, কেমুন আছো বাজান? লগে কেডা?
-ভালো আছি খালা, তুমি কেমন আছো, ইনি তোমার আর একজন বাজান, বাসার মানুষ কোথায় সব?
রিনি, আলো এসে দাঁড়িয়েছে, সবিস্ময়ে রিনি দেখলো আশিক- হাতে এই বড় এক গোলাপের তোড়া নিয়ে মিটিমিটি হাসছে, জুয়েলের হাতে মিষ্টির বাক্স।
আলো যেন আকাশ থেকে পড়লো- আরে কি সৌভাগ্য, ভাইয়া যে, ডিউটি শেষ, কবে এলেন?
-এই তো কিছুক্ষণ আগেই পৌঁছালাম, রিনি, দাওয়াত ছাড়াই চলে এসেছি, এটা নাও।
তোড়া এগিয়ে দিলো, ভদ্রলোক বাসায় এসেছেন দুর্ব্যবহার করা উচিত নয়, তোড়াটা হাত বাড়িয়ে নিয়ে বললো রিনি- কোনো অনুষ্ঠান হচ্ছে না, দাওয়াত কিসের? বসুন।
-রিনি হঠাৎ দেখি ভাইজান অফিসে হাজির, আমি এখানে আসবো শুনে চলে এলেন আমার সাথে,
-খুব ভালো হয়েছে, আমাকে তো কিছু বলনি জুয়েল!
-আলো, তোদের ব্যাপারটা হলো; ঠাকুর ঘরে কে রে- না আমি তো কলা খাইনি, সেই ধরনের।
সবার মিলিত হাসিতে রিনি বুঝলো ওর অনুমানই ঠিক, আলো সবই জানতো। রিনি ফুলের তোড়াটা নিয়ে বললো- আসুন, আমার মায়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দেই।
অবাক আশিক বললো- তোমার মা! উনি তো-
-না, মা আছেন, আমার অন্তরে চিরদিন বেঁচে থাকবেন- আঃ আসুন তো, বেশী কথা বলেন।
-ভাইজান যান, রিনি বিগড়ে গেলে বিপদে পড়বেন, আমরা এখানেই বসি- খালা একটু চা খাওয়াও।
মীরার বেডরুমে এলো ওরা- রিনি সযত্নে গোলাপগুলো ফুলদানিতে রেখে মায়ের ছবি দেখিয়ে বললো- ঐযে আমার মা।
আশিক মুগ্ধ হয়ে দেখতে লাগলো, বললো- কি অসাধারণ দেখতে উনি- আচ্ছা আমি কি বলবো ওনাকে? আন্টি না মা? রিনি লজ্জা পেলেও না বলে ছাড়লো না-
-আপনি আমাকে তুমি করে বলবেন না, আর আমার মাকে আপনি কি বলবেন সে আমি কি জানি?
-রিনি, আমি জানি তুমি খালুকে খুঁজে পেয়েছো, এবার তো সিদ্ধান্ত নাও, আর দেরী কিসের?
-আমি এখনো মনস্থির করতে পারছি না, আমার সময় দরকার।
অধৈর্য্য হয়ে আশিক বলে- আর সময় তুমি পাবে না, দুদিনের মধ্যে আমাকে জানাবে নইলে-
-নইলে কি, আমাকে বাতিল করে দেবেন এই তো? ভালো হবে, তাই করুন।
-জ্বী না প্রেয়সী, ভুল করেও আমি সেটা করবো না, তোমাকে জোর করে ধরে কাজী অফিসে নিয়ে যাবো, সবাই আমার পক্ষে, তুমি একা কি করবে?
শুনে রিনি বিস্মিত হলো, পুরুষের এই মধুর জোরের সাথে ও পরিচিত নয়, সে শুধু দেখেছে পুরুষের রুদ্র রূপ- ভালো লাগার অনুভূতি রিনিকে আচ্ছন্ন করে ফেললো, এই উপলদ্ধি তার কাছে নতুন।
আশিক রিনিকে চুপ হয়ে যেতে দেখে প্রসঙ্গ বদলালো- যাকগে, আমি কি করবো না করবো সেটা সময় মত দেখতে পাবে, তোমার জন্য একটা জিনিস এনেছি, দেখবে?
বলেই পকেট থেকে মখমলের লাল একটা ছোট বাক্স বের করে রিনির দিকে এগিয়ে দিলো, রিনি জানে না নিলে এই দস্যি কেয়ামত করবে, নিলো,
-কি এটা!
-খুলে দেখো।
খুলে দেখলো রিনি এবং মুগ্ধ হয়ে গেলো- ছোট্ট একটা হাত ঘড়ি, মূল্যবান সব পাথর সেট করা, জড়োয়া ব্রেসলেটের মত, ঝকঝক করছে।
-এটা আমি নিতে পারবো না।
-জানতাম, ঠিক আছে দাও, নিতে হবে না, শোনো, মানুষকে কিন্তু তুমিও কম আঘাত করো না, একজনকে দিয়ে দশজনকে বিচার করো, আর এই যুগে এত রক্ষণশীল মেয়ে আমি আর দেখিনি, আমি চলে যাচ্ছি,
বলেই বাক্সটা প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে আশিক ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। রিনি প্রায় দৌড়ে এসে আশিকর পথ আটকে ধমকে উঠলো- কি ছেলেমানুষী হচ্ছে?
আলোরা অবাক হয়ে জানতে চাইলো কি ব্যাপার!
-আর ব্যাপার, একটা সামান্য জিনিস এনেছিলাম শখ করে, অহংকারী মেয়েটা নিলো না ফিরিয়ে দিলো।
-কই দেখি দেখি!
রিনি বাক্সটা আশিকের হাত থেকে নিয়ে বললো-
-এই যে নিলাম, বাপরে কি মেজাজ।
আলো, জুয়েল দেখলো জিনিসটা, প্রশংসায় পঞ্চমুখ- আশিক ব্যাজার মুখে বললো-
-শুধু নিলেই হবে না, পরেও দেখাতে হবে।
পরলো রিনি- এবার খুশী?
খালা এসে উপস্থিত- আম্মু তোমরা খাইবা না? সব ঠান্ডা হইয়া যাইতাছে।
আলো বললো- খালা, এদিকে এসো, এই নতুন মানুষটার নাম আশিক, প্লেন চালায়, আমার ভাই, তোমার আম্মুরে নিয়ে যাবে বুঝেছো?
-হায় হায়, পেলেনে কইরা কই লইয়া যাইবো আম্মুরে, আর আইবো না!
সবাই হাসতে লাগলো, তারপর খেতে বসলো সব।
আশিক খাবারের প্রশংসা করে বললো- খালা খুব মজা হয়েছে আর চিন্তা কোরো না, তোমার আম্মুর সাথে তোমাকেও নিয়ে যাবো, নইলে এত মজার রান্না কে করবে?
খালা এতক্ষণে বুঝলো ব্যাপার, মধুর হেসে বললো
-বাজান তোমাগো দুইজনরে খুব মানাইছে, মন থেইকা দোয়া রইলো তোমাগো জইন্য।
সময়টা খুব উপভোগ করলো সবাই- যাওয়ার সময় আশিক বললো- রিনি, তুমি কি জানো, খালাম্মা তোমার চাইতে অনেক সুন্দরী?
-না জানি না, জানতে- .
বলেই হেসে ফেললো রিনি, আশিক মুগ্ধ হয়ে বললো- তুমি নিশ্চয়ই জানো, হাসলে তোমাকে কি চমৎকার লাগে?
-না মোটেও জানি না, জানতে চাইও না এবং আমাকে তুমি বলা বন্ধ করুন।
-ঈস কি জাঁহাবাজ মহিলা- বলেই তাড়াতাড়ি আলোদের সাথে লিফটে যেয়ে ঢুকলো আশিক।
রিনি হেসে ফেললো।
রাতে পরম শান্তিতে ঘুমালো রিনি- অবশেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে- আবিদ চৌধুরীকে কালই নিয়ে আসবে নিজের কাছে।
রিনি আবিদ চৌধুরীকে আনতে যাচ্ছে। সকালে উঠে দেরী করেনি, সামান্য নাস্তা করেই বেরিয়ে পড়েছে, খালা সব পরিস্কার করেই রাখে তবু বলে এসেছে মা’র ঘরটা ঠিক করে রাখতে- বাবাকে ও ঘরেই থাকতে দেবে- যেতে যেতে ভাবছিলো, আলো খুব মিনতি করে বলেছিলো- মাকে হারিয়েছিস, বাবা আছেন- রাগ জিদ করে এই অমূল্য রতনের অমর্যাদা করিস না, তাছাড়া খালুর যে অবস্থা বললি- বুঝতে পারছি উনি ভালো নেই,
-আমি যে ব্যবস্থা করে দিয়েছি, তাতে একটা মানুষের খুব ভালো ভাবেই দিন কেটে যাবে।
-আমি শুধু অর্থনৈতিক অবস্থার কথা বুঝাইনি- উনি যে ভাবে কান্নাকাটি করেছেন, উনি অনুতপ্ত, আর যে অনুতপ্ত তাকে সুযোগ দেওয়া উচিত, তোর কাছে থাকলে উনিও শান্তি পাবেন, ওনার এখন প্রয়োজন আপনজনের সঙ্গ, সেবা, যত্ন।
চাচার সাথেও ফোনে কথা হয়েছে, তিনিও বলেছেন- রিনি মাঅতীত ভুলে যাওয়াই মঙ্গল, মানুষটা যখন তার ভুল বুঝতে পেরেছে তখন তোর ও উচিত হবে সব ভুলে বাবাকে কাছে নিয়ে আসা।
-চাচা, আমার মা যেখানে ক্ষমা করে গেছেন, আমি আর কেন কিছু মনে রাখবো, আসলে দীর্ঘ দিন একটা মানসিক যন্ত্রণা, তিক্ততার মধ্যে দিয়ে সময় পার করেছি তাই সহজ হতে পারছি না।
আবিদ চৌধুরী চুপ করে শুয়েছিলেন, হঠাৎ রিনিকে সামনে দেখে ধড়মড় করে উঠে বসলেন-
-রিনি মা তুই! কি হয়েছে?
-কিছু হয়নি, আপনাকে নিতে এসেছি চলুন।
-কোথায়!
-বাসায়, মায়ের কাছে।
আবিদ চৌধুরী বোকার মত তাকিয়ে রইলেন মেয়ের দিকে, যা শুনেছেন বিশ্বাস হচ্ছে না-
-বসে আছেন যে, তাড়াতাড়ি করুন, আমাকে দোকানে যেতে হবে।
বাবাকে বাসায় নিয়ে এসে খালাকে নাস্তা দিতে বলে রিনি বেরিয়ে গেলো- তার এখন অনেক কাজ, বসুন্ধরায় যেতে হবে, কদিন ওদিকে মন দিতে পারেনি, যদিও অসুবিধা হয় না, দেখশোনার ভালো লোকজন আছে।
বাবার জন্য শপিং করতে হবে- কোনো কিছু আনতে দেয়নি ওনাকে, সুতরাং যা যা প্রয়োজন সবই কিনতে হবে। আবিদ চৌধুরী সেয়ানা মানুষ, ঠিক মনে করে দরকারি কাগজপত্রগুলো নিয়ে এসেছেন, রিনির হাতে ওগুলো দিয়ে বলেছেন-
-আমি তো আমার মা’র কাছেই চলে এসেছি, ও নিয়ে আমি কি করবো?
রিনির চোখ দিয়ে পানি চলে এসেছিলো- এমন স্নেহের কথা কখনো কি বাবার মুখে শুনেছে?
আলো, জুয়েল এসে আবিদ চৌধুরীর সাথে দেখা করে পরিচিত হয়ে গেছে, আলো খুশীর সুরে বলেছে- খালু, আমি আপনার আর একটা মেয়ে, আমাকে কম ভালোবাসলে কিন্তু রাগ করবো।
অভিভূত আবিদ আলোর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছেন- বর্হিমুখী এই মানুষটা কি কখনো এমন সুখের সন্ধান জেনেছেন? মেয়ে যদিও যথেষ্ট খেয়াল রাখে, যত্নের কোনো কমতি রাখেনি, তথাপি ওর কাছে সহজ হতে পারছেন না, বরং আলোর সাথে দিব্যি গল্প করেন, সহজ ভাবে মিশতেও পারছেন।
রিনি তাকে বাবা বলে একদিনও ডাকেনি- এই কষ্ট রয়ে গেছে, দুঃখের সাথে বুঝতে পারেন যে বাবা ডাক শোনার যোগ্য তিনি নন।
খালাও খুব যত্ন করে- প্রথম দিন তিনি শরবত খাননি- সেই শোক ভুলতে রোজ এখন খালা তার ভাইসাবকে শরবত খাওয়াবেই।
রিনির সাথে চাচার কথা হয়েছে- কয়েকটা দিন যাক, তারপর আবিদের সাথে দেখা করবেন, নতুন এই পরিবেশে মানিয়ে নিতে ওনারও সময় দরকার।
আবিদ ড্রইংরুমে বসে আছেন, টিভি চলছে বটে তবে সেদিকে তার মন নেই, তিনি বারবার ঘড়ি দেখছেন- রাত নয়টা বাজে প্রায়, এখনো রিনি আসেনি, দোকানের কাজ সেরে আসতে ওর একটু সময় লাগে, জানেন তবু অস্থির হয়ে যান। মেয়ের জন্য অপেক্ষা করে আছেন, একসঙ্গে খাবেন- যদিও রিনির কড়া নির্দেশ তাড়াতাড়ি খেয়ে নেবার, খালা বারবার তাগাদা দিয়েছে খেতে কিন্তু তাঁর সিদ্ধান্তে তিনি অটল-
এই প্রতীক্ষা যে কি পরম সুখের, আনন্দের- এতদিন এর স্বাদ থেকে বঞ্চিত ছিলেন বলে নিজেকে অপরাধী মনে হলো।
স্ত্রী- সন্তান- সংসার কি- এর মূল্য কখনো বুঝতে চাননি বলেই এত বছর পরে আজ নতুন করে সব উপলদ্ধি হতে, বড়ই অশান্ত, অস্থির হয়ে উঠলেন।
মীরাকে চরম কষ্ট দিয়ে, অপমান- লাঞ্চিত করে মহা আনন্দে দ্বিতীয়বার বিয়ে করেছিলেন আবিদ- সেই স্ত্রী মীরার মত সহজ সরল ভালো মানুষ ছিলো না- ছলে বলে কৌশলে আবিদের সব সম্পদ হস্তগত করে তাঁর হাড় মাস ভাজা ভাজা করে অবশেষে তাঁরই এক বন্ধুর সাথে পালিয়ে যায়- ভাগ্যিস কোনো সন্তান হয়নি এই স্ত্রীর।
জানে বেঁচে গেলেন আবিদ ঠিকই কিন্তু সব হারিয়ে নিঃস্ব, ভিখারী হয়ে গেলেন তিনি। সেই সব দিনের কষ্টের কথা মনে হলে আজো শিউরে ওঠেন তিনি।
রিনিকে তাঁর জরাজীর্ণ ঘরে দেখে প্রচন্ড অবাক হয়েছিলেন, আরো আশ্চর্য হলেন যখন শুনলেন মেয়ে তাঁকে নিয়ে যেতে এসেছে ওর কাছে থাকার জন্য।
অনেক মানা করেছেন তিনি কিন্তু জেদী মেয়ে নাছোড়বান্দা- আমারই তো মেয়ে, যা জেদ ধরবে, সেটা করেই ছাড়বে- . মনে মনে হেসেছিলেন আবিদ।
রিনি অনেক করেছে তার অকৃতজ্ঞ, অমানুষ বাপের জন্য- পুরো শরীর চেকআপ করিয়েছে, নানা রকম পোশাক, পুষ্টিকর খাবার- পুরুষের দরকারী প্রসাধনী- এবং মীরার বেডরুমে থাকার ব্যবস্থা- এসব কিছুই আবিদকে বুঝিয়েছে যে রিনির শরীরে মীরার রক্তও বইছে।
জীবনে যে মানুষ অর্থ দুহাতে উড়িয়েছেন, সেই মানুষই পরবর্তীতে নিদারুণ আর্থিক বির্পযয়ে পড়ে অমানুষিক কষ্টে দিন যাপন করেছেন- দোষ তাঁরই- যেমন কর্ম তেমন ফল।
বেঁচে থাকার জন্য যে কোনো কাজ তাঁকে করতে হয়েছে, থাকতে হয়েছে সস্তার, দম আটকে আসা বস্তির ঘরে- সুসময়ের বন্ধু কাউকেই আর পাশে পাওয়া যায়নি।
মেয়ে যখন নিয়ে এলো তাঁকে, মুক্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন তিনি।
রিনি এখনো কঠিন হয়েই থাকে- বাবা বলেও ডাকেনি, কথাই বলে কম- তবুও যেন কি এক অনাস্বাদিত পুলকে অন্তর ভরে ওঠে আবিদের।
কঠিন কন্ঠে যখন রিনি বলে- আমার জন্য অপেক্ষা করবেন না, ডাক্তার আপনাকে নিয়মে চলতে বলেছেন, সময় মত খাবেন- আপনার যা দরকার হবে লজ্জা বা দ্বিধা করবেন না, বলবেন আমাকে- তখন কি যে ভালো লাগে আবিদের।
বাসায় থাকলে নিজে সামনে বসিয়ে খাওয়াবে, মেয়ের মধ্যে আশ্চর্য এক কঠোর- কোমলে মিশানো স্নেহময়ী নারীর রূপ দেখতে পান- ঠিক যেন অনেক দিন আগের হারিয়ে যাওয়া তাঁর মা।
আবিদের কাছেও টাকা দিয়ে রাখে রিনি, ব্যস্ততার জন্য অনেক সময় রিনি সময় মত বাসায় আসতে পারে না, যদি কিছু দরকার হয় ওনার, নিজেই কিনতে পারবেন, দামী মোবাইল কিনে দিয়েছে, গাড়িটাও বেশীর ভাগ বাড়িতেই থাকে, কোথাও যেতে মন চাইলে যাবেন আবিদ- মোট কথা মেয়ে তাঁকে অনাবিল সুখ শান্তিতে রেখেছে, কোনো অভাব বোধ করতে দেয়নি।
নির্জনে বসে এসব ভেবে কাঁদেন আবিদ চৌধুরী- জীবনের কতটা অমূল্য সময় এবং ভালোবাসা নিজের দোষে হারিয়ে ফেলেছেন- ভাবলে নিজেকেই নিজের ঘৃণা হয়।।
আলোদের সাথে আবিদের দারুণ খাতির হয়ে গেছে, জুয়েল তেমন সময় পায় না কিন্তু আলো প্রায়ই চলে আসে, খালুর সাথে গল্প করে। আবিদ বুঝেছেন যে রিনির জীবনে ওরা নিঃস্বার্থ বন্ধু হিসাবে কত খানি অমূল্য। আলোর সাথে অনেক কথা হয় আবিদের এবং উনি খুবই উপভোগ করেন।
শুধু রিনি সহজ নয় তাঁর সাথে, বাপের সুবিধা অসুবিধার ওপর সজাগ দৃষ্টি মেয়ের, কিন্তু তিনি সংকুচিত হয়ে থাকেন- মেয়ের বাবা ডাক তিনি এখনো শোনেননি- যে অন্যায় অবিচার মেয়ের প্রতি করেছেন তাতে বাবা ডাক শোনার অধিকার নেই তাঁর- তবু তাঁর অন্তর বুভুক্ষের মত উন্মুখ, লালায়িত হয়ে থাকে মধুর দুটি শব্দ শোনার জন্য।
ভাবনার রাজ্য থেকে ঘোর ভেঙে বাস্তবে ফিরে এলেন আবিদ।
রিনি এসেছে- খালার সাথে কথার জোরালো আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে।
-আমি কি করুম আম্মু, ভাইসাব তো তোমারে ছাড়া খাইতে চান না।
-টেবিলে খাওয়া দাও আর ডাকো তোমার ভাইসাবরে, আমি হাত মুখ ধুয়ে আসছি। খাবার টেবিলে মুখোমুখি বসে বাবা, মেয়ে- কাঁচুমাচু মুখে আবিদ বসে আছেন, মাথা নীচু- রিনি প্লেটে খাবার তুলতে তুলতে বললো-
-আপনাকে কতদিন বলেছি খেয়ে নেবেন, আমার জন্য অপেক্ষা করবেন না, আমার ফেরার ঠিক নেই, আপনি ডায়াবেটিসের রোগী, সময় মত না খেলে চলবে?
টু শব্দ করলেন না একদার প্রবলপ্রতাপশালী আবিদ চৌধুরী- বাধ্য ছেলের মত চুপচাপ খেয়ে শেষে বললেন- একা একা খেতে ভালো লাগে নারে মা, আর এত রাত করিস কেন? এভাবে পরিশ্রম করলে যে শরীর খারাপ হয়ে যাবে।
রিনি কিছু বললো না দেখে আস্তে উঠে ঘরে চলে গেলেন, ও কিছু বলবে সে আশাও অবশ্য করেননি।
স্তব্ধ রিনির অন্তরে ঝড়, চোখে পানি- বাবার এই স্নেহ, মমতা কোনো দিন পায়নি সে- এই রূপ তার অচেনা, পিতৃস্নেহ কি সেটাই তো অজানা।
প্রায়ই সে দেখেছে- রাতের বেলা বাবা ঘরের সামনের বারান্দায় চুপ করে বসে আছেন। রিনি ঘরে ঢুকলেই নীরবে বেরিয়ে এসে খেয়ে শুয়ে পড়েছেন- বুঝেছে রিনি, বাবা তার জন্য উদ্বিগ্ন থাকেন, সে বাসায় ফিরলে নিশ্চিন্তে খেয়ে শুয়েছেন- এটাও রিনির অনাস্বাদিত অভিজ্ঞতা।বাবার প্রতি ঘৃণা, বিতৃষ্ণা কবেই মুছে গেছে- শুধু এতদিনের দুরত্বে তারা কেউই পরস্পরের কাছে সহজ হতে পারছে না।
আলো কদিন আসতে পারেনি, ফোনেই রিনির সাথে কথা হয়েছে, রিনিরও ব্যস্ততা ছিলো-
-রিনি চাচা তো খালুর সাথে পরিচিত হতে চাইছেন, খালুকে বাসায় নিয়ে আসতে বললেন।
-আর কয়েকটা দিন যাক, আমি জানাবো।
-তোকে দিয়ে যে কিছু হবে না, সে আমি বুঝতে পেরেছি, ঠিক আছে তোর কিছু করা লাগবে না, আমিই খালুকে যা বলার বলবো।
-না না, এখনো সময় হয়নি, এত তাড়া কিসের?
-তোমার সময় হবে কতদিনে, সে তুমিই জানো, আর একজন যে তড়পাচ্ছে, খোঁজ রাখো? তোমার ফোন নাম্বারও দিতে চাও না, দেখাও করো না, বেচারা মজনু বাঁচে কিভাবে?
-কি করবো বল, দোকান থেকে ফিরতে দেরী হলে উনি না খেয়ে বসে থাকেন, টেনশন করেন, আমি ওনার জন্য কোথাও যাওয়ার কথা ভাবতে পারছি না, এই তো আর কটা দিন-
-আর সময় পাবে না, আমি কালই আসছি খালুর কাছে- ফোন বন্ধ করে দিলো আলো।
রিনি বিক্ষিপ্ত মন নিয়ে না পারছে বাবাকে কিছু বলতে, না পারছে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে, চাচার সাথে বাবার পরিচয় হওয়া দরকার, উদাস হয়ে ভাবলো দেখা যাক কি করা যায়।
এমনিতেই মন ভালো ছিলো না রিনির, তারমধ্যে রাতে বাসায় ফিরেই মেজাজটা খারাপ হয়ে গেলো, আজও বাবা না খেয়ে বসে আছেন- রোজ রোজ কি পেয়েছেন তিনি? এত দরদ, এত মায়া এতদিন কোথায় ছিলো? নাঃ আজই একটা বিহিত করতে হবে।
আবিদ ঠিক অপরাধীর মত মুখ করে খেতে এলেন, রিনির রাগে শরীর জ্বলছে- পেয়েছেন কি উনি? রিনি কিছু বলে না বলে কি সাপের পাঁচ পা দেখেছেন?
কড়া একটা ধমক দিতে যেয়েও বাবার করুণ মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললো রিনি-
-তুমি যে কি অবুঝ মানুষ না বাবা- বলেই থমকে গেলো রিনি, কথাটা শেষ করতে পারলো না
আবিদ চৌধুরী বিস্ফারিত চোখে চেয়ে রইলেন মেয়ের দিকে, যা এইমাত্র শুনলেন- বিশ্বাস করতে পারছেন না- পরক্ষণেই খুশীর আভায় মুখটা উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো, প্রায় চিৎকার দিয়ে উঠলেন
-মা, মাগো- তুই আমাকে বাবা বলে ডাকলি, সোনা মেয়ে আমার, বাবা বললি!
কেঁদে ফেললেন তিনি- রিনিও কাঁদছে, উঠে এসে বাপকে জড়িয়ে ধরে আকুল হয়ে কাঁদতে লাগলো, আবিদ চৌধুরী মেয়েকে বুকে চেপে যে স্বর্গীয় সুখ পেলেন- তার কোনো তুলনা হয় না- ওদিকে একটু দুরে দাঁড়িয়ে খালাও কাঁদছে, বাবা, মেয়ের এই অভূতপূর্ব মিলন দৃশ্য দেখে সেও আবেগে আপ্লুত হয়ে কেঁদে ফেললো।
এতদিনকার পূঞ্জীভূত ঘৃণা, বিদ্বেষ, অভিমান- সব চোখের পানিতে ধুয়ে মুছে গেলো।
পরদিন রিনি দোকানে গেলো না, আলোকে আসতে বলে বাবার কাছে গেলো, যেয়ে দেখে বাবা মা’র ছবির দিকে স্তব্ধ হয়ে চেয়ে আছেন, নীরবে অশ্রু ঝরে পড়ছে, রিনির গলার কাছে কষ্ট জমাট হয়ে গেলো, একটু চুপ করে থেকে আস্তে ডাকলো;
-বাবা, সাড়া না পেয়ে একটু জোরেই ডাকলো
-বাবা, ও বাবা
চমকে উঠে পিছনে তাকিয়ে অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন আবিদ, দ্রুত চোখ মুছে হাসার চেষ্টা করলেন-
-না মা, চোখে যেন কি পড়েছে, আয় বোস আমার কাছে,
খাটের ওপর বসে রিনির মাথায় হাত রেখে বললেন
-মাগো, তোর এই বুড়ো বাপকে মাফ করে দে, ভুল করেছিলাম, তার শাস্তিও পেয়েছি- বলতে বলতে কেঁদে ফেললেন আবিদ।
-বাবা, তুমি যদি এসব বল আর কথায় কথায় কাঁদো, তাহলে তোমার সাথে আর কথাই বলবো না, তোমাকে কাঁদতে দেখলে আমার বুঝি খুব ভালো লাগে, তাই না? আমরা অনেক কেঁদেছি আর কান্না নয়।
বাপের বুকে মাথা রেখে রিনি তৃপ্তির শ্বাস ফেললো, তার চোখ ও ভেজা।
-মা রে, এ বেদনার নয়- আনন্দের অশ্রু।
-বাবা আজকে আলো আসবে, তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে।
খুশীতে আটখানা আবিদ বিগলিত স্বরে বললেন-
– তাই! বেশ বেশ।
আলো এসে রিনির কাছে সব শুনে আনন্দে নেচে উঠলো তারপর দৌড়ে এসে খালুকে জড়িয়ে ধরে গালে চুমু দিয়ে বলে উঠলো- লক্ষ্মী খালু আমার, আজকে কিন্তু আপনাকে ছাড়ছি না- রিনিও দোকানে যাবে না, জুয়েলকে খবর দিচ্ছি যে খালু আজকে আমাদের চাইনীজ খাওয়াচ্ছেন, আরো দুজন মেহমান থাকবেন খালু, আপনার সাথে পরিচিত হতে আগ্রহী।
-কে মা? আমি কি চিনি তাদের?
-উহু কিছু বলা যাবে না এখন, সারপ্রাইজ।
হাসলেন আবিদ- জীবনের এই অনাস্বাদিত পুলক তিনি তৃপ্তির সাথে উপভোগ করছেন।
রিনি চাচাকে ফোনে বলে দিলো যে আলোর ইচ্ছা প্রথম সাক্ষাৎটা রেস্টুরেন্টেই হোক, পরে বাসায় আসা যাওয়া তো হবেই, চাচা এতে একটু নিমরাজী ছিলেন, ঘরোয়া পরিবেশে মন খুলে কথা বলা যেতো- আলোর বক্তব্য, ওখানেও কথা বলা যাবে, গোপনীয় কোনো ব্যাপার তো নয়, একদম ঘরের কোনাই লাগবে নাকি?
রিনি আশিককে ফোনে বলে দিতে বললো আলোকে, মুখ ভঙ্গি করে দুষ্টু মেয়ে বললো-
-আমি ফোন দিচ্ছি যা বলার তুই বলবি।
-কেন তুই বললে আসবে না?
-বাচ্চা নাকি তুই? কিছু বুঝিস না? আমি আর তুই সমান হলাম?
-তোর ফোন দেয়া লাগবে না, নাম্বার বল আমিই কল দিচ্ছি।
-রিনির সুমতি হলো তাহলে!
-আশিক বলছি, কাকে চাই?
-আপনার নাম্বারে যখন কল দিয়েছি তখন আপনাকে নয়তো কি পাড়ার মুদীকে চাইবো?
-আচ্ছা- ম্যাডাম আপনি! তাই তো বলি এই মধুর বচন রিনি ছাড়া আর কার হতে পারে?
-বেশী কথা না বলে যা বলবো মন দিয়ে শুনুন।
-তার আগে জানতে চাই, সূর্য আজ পূর্ব দিকেই উঠেছে? আমার সাথে এতদিন পরে কথা বলতে মন চাইলো?
-আমি ফোন রাখলাম, দরকার নেই আমার কথা বলার।
-না না কি বলতে চাও বলে ফেলো।
-আজ দুপুরে ফ্রি আছেন? আমরা চাইনীজ খেতে যাবো,আপনার দাওয়াত।
-ওরে বাবা এত দয়া আমার ওপর।
-ফাজলামি রাখুন, আসতে বলেছি, আসবেন ব্যস।
-হুম, কাজ কিছু নেই, তবে একটা ডেটিং ছিলো, ঐ, নতুন একজন বিমানবালা এসেছে, ভারী সুইট, ওর সাথেই আর কি- না করতে পারলাম না।
-ভালো হচ্ছে না কিন্তু, খুন করে ফেলবো একদম।
হা হা করে হেসে উঠলো আশিক-
-ছাড়া গরুর মত ঘুরে বেড়াচ্ছি, আর কত দেরী করবে? গলায় দড়িটা পরিয়ে দাও, নইলে কোন দিন কোন কেলেঙ্কারি করে ফেলবো।
-যা মন চায় করুন, আমাকে বলছেন কেন?
-মন থেকে বলছো?
-হাতের কাছে একটা লাঠি আছে, লাঠিটা নিয়ে বলছি, ফাজিল কোথাকার।
-আচ্ছা পাগলীকে আর ক্ষেপাবো না, তা আমরাটা কে কে?
রিনি বললো আলোরা আর বাবা, তারপর অনুযোগ করলো- আপনি তো একবারও বাবার কথা জানতে চাইলেন না।
-সে কি কথা! আমি আলোর কাছে থেকে সব খবরই পেয়েছি, আর তোমার সাথে তো দেখাও হয়নি, কথা হলো এখন।
রিনি তখন বললো যে তাদের সাথে পরিচিত হবার জন্যই এই আয়োজন, আশিক জানতে চাইলো বাসায় এলেই তো ভালো হোতো, হোটেলে কেন, ওকে জানালো রিনি যে প্ল্যানটা আলোর।
আশিকের সাথে কথা শেষ করে রিনি আলোকে বললো যে বাবাকে যেন চাচার সাথে মা’র পরিচয় ছিলো, এটা না জানানো হয়- কি দরকার অতীতের তিক্ততা বতর্মানের আনন্দপূর্ণ সময়ে টেনে আনার- তিনি আলোর চাচা, এটাই যেন বাবাকে বলা হয়, সবদিক বিবেচনা করে আলো সায় দিলো- তাই হবে।
আলোর সাথে কথা শেষ করে রিনি গেলো তৈরী হতে, আর আলো এলো খালুর ঘরে। আবিদ মাত্র গোসল শেভ সেরে এসে আলমারি খুলে কাপড় কোনটা পড়বেন দেখছিলেন, আলোকে দেখে হাসিমুখে বললেন- আয় মা, মুখটা শুকনো লাগছে কেন রে? চা টা কিছু খেয়েছিস, না কি দুই বান্ধবী শুধু কথাই বললি?
-না খালু খেয়েছি, রিনি যা মেয়ে, না খাইয়ে ছাড়বে? আপনার দেখি গোসল শেষ, আপনি বসুন, আমি পোশাক পছন্দ করে দিচ্ছি কোনটা পড়বেন।
-হ্যাঁ, মা তাই দে, ফিটফাট পরিচ্ছন্ন না থাকলে রিনি রাগ করে, দেখ তো, আমি বুড়ো মানুষ একরকম থাকলেই তো হলো।
-কে বলেছে আপনি বুড়ো, এখনো যা দারুণ দেখতে আপনি-
কথা শুনে হাসতে লাগলেন আবিদ- এই দারুণ থাকার কৃতিত্ব সম্পূর্ণ রিনির- বাপকে ঘসে মেজে, যত্ন করে একদম বদলে দিয়েছে তাঁকে।
-খালু এই কাপড় বের করে দিলাম, তৈরী হয়ে নিন, তবে একটু দরকারি কথা সেরে নেই আপনার সাথে।
-বল মা কি বলবি।
-রিনির বিয়ের কথা কিছু ভেবেছেন?
-ভেবেছি মা কিন্তু আমার ইচ্ছে হলেই তো হবে না, মেয়ের ওপর জোর করার অধিকার যে আমি হারিয়ে ফেলেছি।
বিষন্ন শোনালো আবিদের কন্ঠ স্বর, আলো ওনার হাতটা ধরে মোলায়েম ভাবে বলে-
-না খালু, এভাবে বলবেন না, রিনি শুনলে কষ্ট পাবে, ও কি শুধু খালাম্মার শেষ ইচ্ছে পূরণের কথাই ভেবেছে? আপনার জন্যও উদ্বিগ্ন ছিলো, ওপরে যতই কঠোরতা দেখাক, অন্তরে আপনার জন্য যে অনুভূতি টের পেয়েছি, সেটা খাঁটি, আমরা বিয়ের জন্য অনেক বলেছি কিন্তু ও রাজী হয়নি শুধু আপনার সন্ধান পায়নি বলে।
-আমিও সেটা বুঝতে পারি, নইলে আমাকে কোন অন্ধকার অতল থেকে উদ্ধার করে সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের ব্যবস্থা করলো- সে যাক, আমাকে কি করতে হবে বল?
-ভালো ছেলে পেলে বিয়ে দেবেন ওর?
-আছে মা তোর জানা কেউ? অবশ্যই আমি মেয়ের বিয়ে দেবো, আমার তো এখন কারো সাথে মেলামেশা নেই, নইলে আমার মেয়ের আবার পাত্রের অভাব।
-খালু,আমার চাচাতো ভাই আশিক আহমেদ- বাংলাদেশ বিমানের পাইলট, আপনার অপছন্দ হবে না, আজকে চাচা আর ঐ ভাইয়ের সাথেই তো পরিচয় হবে আপনার।
-রিনি কি রাজী হবে, যে জেদী মেয়ে, আমারই তো- বাপের মত গোঁয়ার তো হবেই।
-আপনি একদম চিন্তা করবেন না, আমরা আছি কি করতে? রিনিকে আমার বোনের মতই দেখি।
সস্নেহে আলোর মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন আবিদ
-আমাকে বলতে হবে না রে আমি জানি, প্রোগ্রাম দুপুরে করলি কেন? রাতেই তো ভালো ছিলো।
-না খালু, আশিক ভাইয়ের ফ্লাইট আছে রাতে, আজকে আমরা আনুষ্ঠানিক ভাবে পরিচিত হই তারপর কত আমোদ আনন্দ করবো, আমি দেখি রিনির কদ্দুর হলো, আপনিও রেডি হন।
রিনিকে দেখে আলো বাক্যহারা হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো- আজও শাড়ী পরেছে- ময়ূরকন্ঠী রঙের অপূর্ব সুন্দর জামদানী, ম্যাচ করা ব্লাউজ, খোপা করেছে, ঘন কালো চুলের রাশি মৌচাকের মত ঘাড়ে শোভা পাচ্ছে- কানে ছোট্ট ঝুমকা এবং হাতে শুধু আশিকের দেওয়া চমৎকার ঘড়িটা, ব্যস আর কোনো অলংকার পরেনি- হালকা প্রসাধন করেছে মুখে- এতেই অসাধারণ লাগছে রিনিকে।
-তুই কি আমার ভাইটাকে মারবি! আমিই তো চোখ ফেরাতে পারছি না-
-কি অলুক্ষুণে কথা- তোর ভাই মেয়ে আর দেখেনি?
-মেয়ে তো হরদমই দেখছে, তবে রিনিকে আগে দেখেনি।
-বেশ করেছে, বাজে কথা রাখ, শোন চাচাকে মা’র কথা বলতে মানা করে দিয়েছিস তো?
আলো সায় দিলো, ইতিমধ্যেই জুয়েল এসে পড়লো আবিদ খুব খুশী হলেন ওকে দেখে, অনুযোগ করলেন সে আসে না, জুয়েল হেসে বললো- খালু ব্যস্ততা বেড়েছে সময় পাই না, তবে আলোর কাছে থেকে খবর ঠিকই পাই।
সবাই রওনা হলো- আবিদ বসেছেন পিছনের সীটে, মাঝখানে তিনি, দুই পাশে দুই মেয়ে, জুয়েল সামনে, খুশীর হাওয়া বইছে গাড়ির মধ্যে, হাসি কথা, খুনসুটি হচ্ছে আলোদের, আবিদও ওদের কথায় যোগ দিচ্ছেন, এই আনন্দ তিনি কখনো পাননি।
ঢাকার নামকরা একটা চাইনীজ রেস্টুরেন্টের সামনে গাড়ি থামলো- জুয়েলই সব ব্যবস্থা করেছে, সবাই যেয়ে রিজার্ভ করা টেবিলে বসলো, আশিকরা তখনও এসে পৌঁছেনি।
হোটেলে অন্য যারা এসেছে, সবাই ঘুরে ওদের দেখছে, আলো আর রিনি বসেছে পাশাপাশি, আলো ফিসফিস করলো- দেখেছিস, তোকে কিভাবে সবাই দেখছে।
-হ্যাঁ আর তুই তো অদৃশ্য হয়ে আছিস, তোকে কেউ দেখতে পাচ্ছে না।
-ঈস আমি বুঝি তোর মত সুন্দরী?
আবিদ টেবিলে রাখা মেনু কার্ড দেখছেন, জুয়েল দেখছে ঘড়ি, বিরক্তি প্রকাশ করছে ক্ষণে ক্ষণে
-এত দেরী করছেন কেন চাচারা!
আবিদ মৃদু হাসলেন- বাবা, তোমার বোধহয় খিদে পেয়েছে।
লজ্জা পেয়ে জুয়েল কিছু বলতে যাবে, আলো বলে উঠলো- ঐ তো চাচারা এসে গেছেন।
চাচা হাসিমুখে এগিয়ে এলেন ওদের দিকে, পাশেই আশিক, পরনের কালো প্যান্ট, হলুদ শার্ট- শুধু যে দামী তা নয় শৌখিন পুরুষের রুচির পরিচয়ও দিচ্ছে।
রিনি উঠে এসে বাবার পিছনে দাঁড়িয়ে কাঁধে হাত রেখে বললো, চাচা আমার বাবা, বাবা উনি আলোর চাচা।
আবিদ চৌধুরী উঠে দাঁড়ালেন, আলীম আহমেদ কাছে এসে দাঁড়িয়ে হেসে বললেন- ভাই সাহেব কিছু মনে করবেন না, রাস্তায় এত ভীড়, দেরী হয়ে গেলো, আমি আলীম আহমেদ, ও আমার ছেলে আশিক, বাংলাদেশ বিমানের পাইলট।
-আমি আবিদ চৌধুরী, পরিচিত হয়ে খুশী হলাম
আশিক এগিয়ে এসে আবিদের পা ছুঁয়ে সালাম করতে যেতেই আবিদ ওকে বুকে টেনে নিলেন-
-না, বাবা তোমার জায়গা আমার বুকে, পা ছুঁয়ে সালাম করতে হয় না, হাত তুলে সালাম করবে। সবাই বসতে ওয়েটার এগিয়ে এলো অর্ডার নিতে, জুয়েল বললো- আজকে আমরা খালুর গেষ্ট সুতরাং উনি মেনু ঠিক করবেন-
ঘোর আপত্তি জানালেন আবিদ- সেটা হবে না, সবার পছন্দের খাবার অর্ডার করা হবে, আমি একা কিছু বলবো না।
তাই হলো, কিছুক্ষণ- মেনু নিয়ে,আপনি বলুন, তোমরা বলো এই চললো, অবশেষে খাবার অর্ডার করা হলো।
আবিদ খেতে খেতে চাচার দিকে চেয়ে হেসে বললেন- আপনার ছেলে তো রাজপুত্রের মত দেখতে।
-অবশ্যই, নইলে আপনার রাজকন্যা মেয়ের সাথে মানাতো নাকি? এদিকে রাজপুত্র মুগ্ধ নয়নে সবার অগোচরে তার রাজকন্যাকে দেখছে, রাজকন্যার অবস্থা কাহিল, লজ্জায় লাল হয়ে আছে, ভালো করে খেতেও পারছে না। আলো সবই খেয়াল করেছে, আস্তে করে বললো-
-কি রে বলেছিলাম না? পাইলট সাহেবের অবস্থা খারাপ।
আলীম সাহেব বললেন- ভাই সাহেব আর দেরী করার দরকার কি? তাড়াতাড়ি দিন ঠিক করে ফেলুন- ছেলে মেয়ের হাত এক করে দেই- তারপর আমাদের দায়িত্ব শেষ।
এক চামচ ফ্রায়েড রাইস মুখে দিয়ে সানন্দে মাথা নাড়লেন আবিদ- আমার কোনোই আপত্তি নেই।
জুয়েল মুরগীর রানে কামড় দিয়ে বললো- শুভ কাজে দেরী করার দরকারই বা কি।
আলো কোকের গ্লাসে চুমুক দিয়ে গিলে নিয়ে বললো- আমি সবার সাথে একমত, কি ভাইয়া কিছু বলার আছে?
আশিক দুটো চিকেন বল এক সাথে মুখে পুরে একটু চিবিয়ে নিয়ে অম্লান ভাবে বলে উঠলো-
– মিয়া বিবি রাজী-
হা হা করে হেসে উঠলেন বাপ চাচারা- রিনি লজ্জায় রাঙা মুখ তুলতেই পারছে না, কোনো আক্কেল নেই, মুরুব্বীদের সামনে- কি লজ্জা, মানুষটা এমন বেকায়দায় ফেলবে ওকে কে জানতো। হাসতে হাসতে সবাই অস্থির, আলো মন্তব্য করলো- তো এই হচ্ছে অবস্থা, সুতরাং জলদি কাজী ডাকেন।
প্রচুর হাসি রসিকতায় সময়টা কেটে গেলো, আশিক জানালো ওর ফ্লাইট শেডিউল জেনে বলবে কবে ফ্রি থাকবে- সময় ঠিক করে কথা পাকা করা হবে সেদিন।
আবিদ চৌধুরী কোনো দিন ভুলবেন না এই অনাবিল নির্মল আনন্দের অনাস্বাদিত মধ্যাহ্ন।
শাড়ী পরা রূপসী মেয়েটির লজ্জা রাঙা মুখ দেখে খুশীতে আপ্লুত হয়ে ভাবলেন- এই পরীটা আমারই মেয়ে।
এর দুদিন পরই আলীম সাহেবের আমন্ত্রণে আবিদ চৌধুরী এলেন ওনার বাসায় বিয়ের কথাবার্তা পাকা করতে, রিনিকেও আসতে বলা হয়েছিল কিন্তু সে রাজী হয়নি সুতরাং আলো জুয়েলরা আর আবিদ সাহেব ছিলেন।
সবাই খুব খুশীর আবহে আলাপ করছেন, জুয়েল হচ্ছে সর্ব কাজের কাজী, ওর ওপর আলীম আহমেদের অগাধ আস্থা, আশিক তার কাজ নিয়ে এত ব্যস্ত থাকে যে সময় পায় না তেমন, সুতরাং আলো ও জুয়েলই ওনার সব খোঁজ খবর রাখে।
জুয়েল বললো- চাচা মুস্কিল হয়েছে, এত তাড়াতাড়ি কোনো সেন্টার ভাড়া পাওয়া যাবে না, অন্তত ছয়মাস আগে থেকে বুকিং দিতে হয়, আমি কয়েকটা সেন্টারে খবর নিয়েছি, খালি নেই।
আবিদ চিন্তিত হয়ে বললেন- তাহলে কি ব্যবস্থা করা যায়, মানুষজনকে তো দাওয়াত দিতে হবে। শেষে ঠিক হলো যে পানচিনি হবে রিনিদের বাসাতেই আর হলুদ, মেহেদী সন্ধ্যাও ঐ বিল্ডিংয়ের ছাদেই শামিয়ানা টাঙিয়ে করা যাবে, আলাদা করে হলুদ নয়, একসঙ্গেই সারা যাবে- তবে বিয়ে আর বৌভাত নিয়ে সমস্যা হয়ে গেলো, না না করেও তো মেহমানের সংখ্যা কম হবে না- এখন কি করা যায়?
জুয়েলই একটা বুদ্ধি বের করলো- আপাতত একদম ঘনিষ্ঠ যারা, তাদেরই বলা হোক- সেটার জন্য চাইনীজ রেষ্টুরেন্ট পুরোটা বুক করলেই হবে, পরে কমিউনিটি সেন্টার ভাড়া করে সবাইকে দাওয়াত করে বড়সড় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা যাবে, বিয়ে বৌভাত একসঙ্গেই।
চাচা খুঁতখঁত করতে লাগলেন- বিয়ে, চাইনীজ রেষ্টুরেন্টে? কাচ্চি বিরিয়ানি, রোষ্ট, কাবাব বোরহানি ইত্যাদি সুখাদ্য ছাড়া কল্পনা করা যায়! ভাতের ফ্যানের মত সুপ, পোড়া হলুদ রঙ মিশানো মুরগী, গিলা গিলা কতগুলো সবজির বিস্বাদ ঘ্যাট- এই খাবার দিয়ে নাকি বিয়ে? শাহী খানা গলা পযর্ন্ত ঠেসে খেয়ে মানুষ তারিফ করবে, তবেই না বিয়ের সার্থকতা।
ব্যাজার মুখে কথাগুলো বলে চাচা সর্মথনের আশায় আবিদের দিকে তাকালেন, আবিদ হাসলেন- কি আর করবেন, যে যুগের যে নিয়ম।
আশিক কিন্তু খুশীই হলো, বাবার শরীরও ইদানীং ভালো থাকছে না, সেই কথা চিন্তা করে বাড়তি কোনো হাঙ্গামা করার ইচ্ছে ছিলো না, তবু সেটা বুঝতে না দিয়ে বললো-
-বাবা জুয়েল যেটা ম্যানেজ করতে পারবে না তখন বুঝতে হবে যে আর কোনো মানব সন্তান সেটা পারবে না, ওর ব্যবস্থাই মেনে নাও। ছেলেও যখন বলছে তখন কি আর করা, তবে তাই হোক- পরক্ষণেই উনি ব্যস্ত হয়ে বলে উঠলেন-
-আলো মা, কথায় কথায় ভুলেই গেছিলাম, রিনি মাকে খাবার পাঠাবার ব্যবস্থা কর এখনি, খেয়ে যেতে যেতে ভাই সাহেবের তো আরো রাত হবে, ততক্ষণ কি মা না খেয়ে বসে থাকবে? তাছাড়া আমার কথা তো শেষ হয়নি আরো কিছু বলবো।
আলো মুচকি হেসে বললো- দেখেছো, চাচা রিনিকে পেয়ে আমাকে ভুলেই গেছেন, আমিও তো না খেয়ে আছি।
-না মা, তুই আর জুয়েল আমার জন্য যা করিস, সেটা কি অস্বীকার করা যায়? আমার ছেলে তো আকাশ পথেই ব্যস্ত থাকে, তোরা না থাকলে এই বুড়োর কি অবস্থা হোতো বলতো? তাছাড়া তুই হচ্ছিস কনের মাসি- বরের পিসী- তোর হাতেই তো সব রে মা।
আলো চাচার কাছে এসে কাঁধে হাত রেখে সস্নেহে ওনার কপালে চুমু দিয়ে বললো- বুড়ো ছেলেটা বুঝলো না যে আমি দুষ্টুমি করেছি, আমি এখনি খাবার পাঠাচ্ছি আর আপনারাও খেতে চলুন, রাত হচ্ছে, আপনাকে, খালুকে তো আবার ওষুধ খেতে হবে।
-হ্যাঁ, মা এই উঠছি, টেবিলে খানা লাগাতে বল।
আবিদ চৌধুরী সতৃষ্ণ নয়নে চেয়ে দেখলেন এই অভূতপূর্ব মায়ার বন্ধন, অভাগা তিনি- এই স্বর্গীয় ভালোবাসার আস্বাদ অনেক দেরীতে পেয়েছেন।
আশিকদের বার্বুচি রাঁধে চমৎকার- টেবিলে পরিবেশন করা খাবারের সমারোহ দেখে আবিদের চোখ ছানাবড়া- বড় ডিশ ভরা কাচ্চি বিরিয়ানি, আস্ত মুরগীর রোষ্ট, হাঁসের ডিম ভুনা, শামী কাবাব, সুদৃশ্য কাঁচের জগ ভর্তি বোরহানী- ভয়ে ভয়ে বললেন- আরো আছে কি?
-হ্যাঁ, শেষ পাতে দই ও মিষ্টি।
অম্লান মুখে বললেন আলীম, আবিদ কাতর স্বরে বললেন- বেয়াই, আমার ডায়াবেটিস, প্রেশারও কম নয়, এত কিছু খেলে রিনি ভয়ানক রাগ করবে, জানেন তো না, কম তেল মশলায় রান্না প্রায় সেদ্ধই খাওয়ায় মেয়ে আমাকে।
খুব হাসলেন আলীম সাহেব, তারপর সান্ত্বনার সুরে বললেন- আপনি শুরু করুন তো, একদিন খেলে কিছু হবে না, রিনিকে আমরা বলবো না, আপনি নির্ভয়ে খান।
-হ্যাঁ, ওকে খাবার পাঠিয়েছেন না? ও তো জানবেই যে কি রান্না হয়েছে, বাসায় ঢুকলেই তো দারোগার মত জেরা করবে- আমি সব খেয়েছি কিনা, কতটুকু খেয়েছি- বুড়ো বয়সে মিথ্যা বলবো? ও ঠিক ধরে ফেলবে, জানে তো আমি ভোজনরসিক, আপনার দোহাই দিয়ে কি আর মেয়ের হাত থেকে রেহাই পাবো?
আবিদের কথা শুনে সবাই হেসেই বাঁচেনা বিশেষ করে আশিক তো মুচকি মুচকি হাসছে আর আস্তে মন্তব্য করছে- দারোগা মানে? এক হাতে লোহার রড অন্য হাতে বন্দুক নিয়ে মহিলা দারোগা।
-আপনি এতো এলাহী কারবার করেছেন কেন? অল্প স্বল্প করে করলেই হোতো, আজকেই তো দেখি বিয়ে বাড়ির আয়োজন করে ফেলেছেন, শুভ কাজটা তাহলে সেরে ফেললে ভালো হোতো, আপনার কোনো আফসোস থাকতো না।
আবিদের সরস মন্তব্য- হাসির দমক কমলে আলো লাফিয়ে উঠলো- জুয়েল এখনি যাও, রিনিকে ধরে নিয়ে এসো- বিয়েটা হয়ে যাক, বাকি সব পরে দেখা যাবে।
বলেই আলো আড় চোখে আশিকের দিকে তাকালো- ভাইয়ের চোখে মুখে তখন প্রত্যাশার দীপ জ্বলজ্বল করছে।
জুয়েল ধমকে উঠলো- উঠলো বাই তো কটক যাই, খালু ও হচ্ছে নাচুনী বুড়ি, তার মধ্যে ঢোলের বাড়ি, ওর কথায় কান দেবার দরকার নেই।
খাওয়া যখন প্রায় শেষ পর্যায় তখন আলীম সাহেব বললেন- দেখুন, আমার সর্বশেষ কথাটা হচ্ছে- আমার একটাই সন্তান, বেয়াই আপনারও তাই সুতরাং আসুন একটা নতুন নিয়ম চালু করি- বিয়ের পর রিনি সপ্তাহের তিন দিন আপনার কাছে, বাকি চারদিন আমার কাছে থাকবে আর এর মধ্যে দরকার হলে তো আসা যাওয়া হবেই, তারপর আপনিও এসে থাকবেন, আমিও যাবো, বেশ হবে তাই না?
হতাশার সুরে আশিক বলে উঠলো- বাঃ নিজেদের সুবিধা মত নিয়ম বানালে, যে কদিন বৌ বাপের বাড়ি থাকবে- আমি থাকবো কোথায়?
-দেখেছেন বেয়াই, আজকালকার ছেলেপুলেরা মুরুব্বী মানে না, শরম নেই, হতভাগা, পাজী- কেন তুই তখন শ্বশুর বাড়িতেই থাকবি।
-চিন্তা কোরো না বাবাজী, জামাই আদর কম হবে না তোমার-
বলেই হো হো করে হেসে উঠলেন আবিদ- সাথে সবাই যোগ দিলো। সে রাতটা আমোদে আনন্দে স্মরণীয় হয়ে থাকলো।
রিনি যথাসময়ে আলোর কাছে বিস্তারিত সব জানলো, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলো হবু শ্বশুরকে আর আশিকের চোদ্দ পুরুষ উদ্ধার করে ছাড়লো।
পরদিন রাতের খাবারের পর রিনি এলো বাপের ঘরে- বাপকে দরজা বন্ধ করতে দেয় না, ভিড়ানো থাকে- প্রায়ই রাতে বাইরে থেকে উঁকি দিয়ে বাবাকে দেখে যায় রিনি, একদিন দেখেছে মা’র ছবির সামনে উপুর হয়ে অঝোরে কাঁদছেন বাবা আর অস্ফুটে বলছেন- মীরা, ওগো মাফ করে দাও, তোমাকে চিনতে ভুল করেছিলাম, এবং অন্যায় অত্যাচার করেছি- এই পাপের সাজা আমি পেয়েছি তোমাকে হারিয়ে, ফিরে এসো, একবার ফিরে এসো, আর বকবো না, আর মারবো না তোমাকে- অনেক আদর করবো, ভালোবাসবো-
রিনির শরীর শিরশির করে উঠেছে, বাপের প্রতি মায়ায় সমবেদনায় অন্তর ভরে গেছে, নিঃশব্দে সরে এসেছে- তারও দুচোখ অশ্রুতে পরিপূর্ণ।
মেয়েকে দেখে আবিদ হাসলেন- কিরে মা, ঘুম আসছে না? আয় বোস আমার কাছে।
-তুমি ও তো ঘুমাওনি,
-এই যে শোব এখন, আসলে মনটা খুব ভালো লাগছে, খুশীতে ঘুম আসতে চাইছে না, বলবি কিছু?
-হ্যাঁ, চাচার সাথে যা কথা হয়েছে, তুমি বলেছো, আলোর কাছেও শুনেছি, বাবা তোমার যা মন চায় কাউকে কিছু দিতে , বিনা দ্বিধায় দাও, আমার ওপর নির্ভর করতে হবে না, তোমারই টাকা, ব্যাঙ্কে জমা রয়েছে, তুমি তো হাতই দাওনি ওতে।
-মাগো তুই এত ভাবিস আমার জন্য- অথচ- অথচ- আমি কি করেছি তোর সাথে-
বলেই ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন আবিদ।
-বাবা,তুমি আর মা কান্নার প্রতিযোগিতা হলে কে জিততো বলোতো? মা ও খালি কাঁদতো, নাঃ তোমাকে নিয়ে আর পারিনা, সব ভুলতে পারছো না কেন? আমি কিন্তু রেগে যাচ্ছি বাবা।
-রাগ করিস না মা, তোকে ছাড়া আর কাকে বলবো- ঠিক আছে, এখন তো রাত হয়ে গেছে, কালকে বসে তোর সাথে একটা হিসাব করবো, আমি সবাইকে আমার মন মত জিনিস দিতে চাই,
-নিশ্চয়ই বাবা, টাকার জন্য চিন্তা করবে না, এত বছরে কম টাকা জমেনি ব্যাঙ্কে।
-রিনি, তোকে একটা জিনিস দেবো, নিবি তো?
-কেন নেবো না! কি জিনিস!
কিছু না বলে আবিদ উঠে আলমারি খুললেন, এটা ওনার জন্য কেনা হয়েছে, মীরার আলমারি আলাদা, বিশেষ প্রয়োজন না হলে রিনি মা’রটা খোলেনা।
আবিদ একটা কিছু বের করে নিয়ে রিনির সামনে দাঁড়ালেন, তারপর ডান হাত বাড়িয়ে দিলেন ওর সামনে- বাপের হাতের দিকে তাকিয়ে স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে রইলো, নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না।
বাবার হাতে সেই সোনার হার, যেটা ওর প্রথম জন্মদিনে উনি দিয়েছিলেন- লকেটে রিনি লেখা।
আবিদ চৌধুরী ছলছল চোখে রিনির দিকে হারটা হাতে নিয়ে তাকিয়ে আছেন- নিঃশব্দ কয়েকটা মুহূর্ত কেটে গেলো- তারপর বিস্মিত সুরে রিনি বললো- বাবা! আর কিচ্ছু বলতে পারলো না।
-আমি সব শেষ করে ফেলেছি মা কিন্তু এই জিনিসটা প্রাণপণে আগলে রেখেছিলাম, ভেবেছি তোর সাথে আমার দেখা হলে তোর এই আমানত তোকে ফিরিয়ে দেবো, মীরা কোনো কিছুই নেয়নি, তার রেখে যাওয়া সব কিছু আমি হেলায় ফেলে রেখেছিলাম, ধরেও দেখিনি, যখন দেখলাম তখন প্রায় সবকিছুই আমার জীবনের শনি গ্রাস করে ফেলেছিলো কিন্তু এটা পারেনি, বুকে করে রেখেছিলাম-তোকে দেবার মত আজ আমার আর কিছু নেই এটা ছাড়া- নিবি না মা? নাকি মীরার মত অভিমান করে ফিরিয়ে দিবি?
এবার রিনি কেঁদে ফেললো- বাপের হাত থেকে হারটা নিয়ে বুকে চেপে ধরে আকুল হয়ে কাঁদতে লাগলো- চিনতে পেরেছে সে এই অমূল্য ধন- বাবার দেওয়া তার জীবনের প্রথম উপহার- মা এটা প্রায়ই ওকে পরিয়ে দিতেন।
আবিদ মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে কৌতুকপূর্ণ স্বরে বললেন- কান্নার প্রতিযোগিতায় কে জিতবে বলতো এবার পাগলী মেয়ে?
চোখে পানি নিয়ে হেসে উঠলো রিনি- ওর হাত থেকে হারটা নিয়ে সযত্নে গলায় পরিয়ে দিলেন তিনি।
-বাঃ কি সুন্দর দেখাচ্ছে আমার মামনিকে, খুলিস না মা পরে থাক, আর রাত অনেক হলো যা শুয়ে পড়- বাকি কথা কাল হবে। বিছানায় শুয়ে হারটা আনমনে নাড়াচাড়া করতে করতে রিনি ভাবছে- কম করে হলেও এটার ওজন পাঁচ ভরির কম হবে না, সোনার মূল্য আকাশ ছোঁয়া- অভাবে, দারিদ্র্যে কত কষ্ট করেছেন বাবা কিন্তু তবুও এটা বিক্রি করেননি, বিক্রি করলে অনেক টাকা পেতেন এবং স্বচ্ছল ভাবেই থাকতে পারতেন তবু এটা হাতছাড়া করার কথা ভাবেননি- আরো একটা কথা ভেবে রিনি আশ্চর্য হলো- ছোট বাচ্চা মেয়ের জন্য হারটা ছোট করে তৈরী করাননি, বড় হয়েও যাতে পরতে পারে সেটাই বাবার উদ্দেশ্য ছিলো, অথচ সেসময় ওদের প্রতি টান মায়া কিছুই ছিলো না তাঁর অন্তরে- ব্যবসায়ী মানুষের দুরর্দশিতার প্রমাণ পাওয়া গেলো এতে, হারটা সুন্দর ওর গলায় হয়েছে, একটুও আঁট হয়নি- এতে আমার মায়ের হাতের স্পর্শও রয়েছে- ভাবলো রিনি তারপর লকেটটা মুঠোয় চেপে ধরে ঘুমিয়ে পড়লো।
পরদিন আর দোকানে গেলো না রিনি, অনেক কাজ আছে, সময় বেশী নেই, বাবার সাথে বসে কাকে কি দেবেন, ঠিক করে ফেলতে হবে, ব্যাঙ্ক থেকে টাকাও তুলতে হবে, সেটা অবশ্য দোকানের ম্যানেজারকে দিয়েই হবে- এছাড়াও বাবাকে আরো একটা বিষয়ে জানাতে হবে, এতদিন বলেনি, এখন সময় হয়েছে।
নাস্তা সেরে বাপ বেটি বসলো খাতা কলম নিয়ে, বাবা সবার কথা চিন্তা করেছেন, আলো থেকে শুরু করে খালাও আছে, যদিও মানা করা হয়েছে তবু জামাইকে তিনি হিসাবের বাইরে রাখেননি। বাবার সাথে কিছুদুর আলোচনা করে রিনি বললো
-বাবা তোমাকে কিছু কথা বলবো, মন দিয়ে শোনো।
রিনি রাজুর কথা সব বিস্তারিত বলে গেলো- আজকের রিনির পেছনে ঐ মহৎ প্রাণ মানুষটির অবদান কিছু কম ছিলো না- দুঃসময়ে বুক দিয়ে আগলে রেখেছিলেন রাজু মামা- রিনির সাথে স্তম্ভিত আবিদের চোখও শুকনো রইলো না- তাঁরই অফিসের পিয়ন! এতটা মানবিকতা নিয়ে তাঁর স্ত্রী, কন্যার পাশে ছিলো! আর তিনি?- ধিক্কার দিলেন নিজেকে।
বাবার ফ্যাকাসে মলিন মুখ দেখে কষ্ট হলো রিনির, সান্ত্বনা দিয়ে বললো- বাবা অতীত মনে রেখো না- ঐসব নেগেটিভ চিন্তা ভাবনা আমাদের ভালো কিছু পেতে বাঁধা দেবে- আমরা নতুন করে জীবন শুরু করেছি- সামনের আলোকিত পথে আমরা হাসিমুখে এগিয়ে যাবো।
রিনি বাবার সাথে শপিংএ গেলো না, আলোকে দায়িত্ব দিলো কেনাকাটায় বাবাকে সাহায্য করতে, জুয়েল ভার নিলো পানচিনি থেকে শুরু করে বিয়ের সব অনুষ্ঠান সুচারু ভাবে সম্পন্ন করতে।
আশিকের সাথে রোজ ফোনে কথা বলতে রিনি নারাজ, আর কদিন পরেই তো দুজনের প্রতীক্ষা শেষ হবে, এখন একটু দুরে দুরে থাকাই ভালো- আশিকের মেজাজ খারাপ- কি নিষ্ঠুর মেয়েরে বাবা- আচ্ছা, বিয়েটা হোক, কত গমে কত আটা বুঝিয়ে ছাড়বো- সুদ সমেত সব উসুল করা হবে।
পানচিনিতে যেহেতু ওরা কজনই তাই রান্না করলো খালাই- আর আলোতো কদিন থেকে রিনির বাসাতেই আছে- সন্ধ্যায় আসবেন চাচা, আশিক, আংটি পরাতে- আলো তার আগেই রিনিকে পার্লার থেকে সাজিয়ে এনেছে- আশিকরা রিনির সাজপোশাক, প্রসাধনী, গয়না সব আগেই পাঠিয়ে দিয়েছে- যদিও প্রচুর গয়না ছিলো, তারপরও আশিক হীরার আংটি কিনেছে, সেটাই পরিয়ে দিলো সুসজ্জিতা রিনির আঙুলে, আবিদও পিছিয়ে নেই, বড়সড় দামী পোখরাজের আংটি কিনেছিলেন জামাইয়ের জন্য- রিনি আলতো ভাবে আশিকের আঙুলে সেটা পরিয়ে দিলো, তুমুল করতালি ও ছবি তোলার মধ্যে দিয়ে পানচিনি শেষ হলো।
আপ্যায়ন শেষে দুই বেয়াই কোলাকুলি সেরে একজন অন্য জনকে বললেন-
-আমার সৌভাগ্য, যে রিনির মত লক্ষ্মী একটা বউমা পেয়েছি।
-আর আমি ধন্য, আশিকের মত হ্নদয়বান জামাই পেয়ে।
আশিক সুযোগ বুঝে রিনির কানে কানে ফিসফিস করলো- হ্যাঁ গো, আমরা কোলাকুলি করবো না?
একটু দুরেই বাপ, শ্বশুর দাঁড়িয়ে, কিছু বলতেও পারছে না, হাসতেও পারছে না রিনি।
আলো ঠিকই খেয়াল করেছে, কড়া সুরে বলে উঠলো- এই, কি হচ্ছে? আমি কিন্তু এখন কনের মাসি।
আশিক আলোকে একটা ঘুসি দেখিয়ে সরে গেলো। পরে দুই বান্ধবী এই নিয়ে প্রচুর হাসাহাসি করলো।
আবিদ আলোদের সাথে কথা বলে ঠিক করলেন-
এই বিল্ডিংয়ের প্রত্যেক ফ্ল্যাটেই আশিকের আনা মিষ্টি দেবেন, একদুজনকে তো দাওয়াত করা যায় না, বলা হবে এখন বিয়ে এবং পরে রিশেপসান, শুধু ওদের পাশের ফ্ল্যাটের সবাইকে দাওয়াত দেবেন, হলুদ বিয়ে সবটাতেই।
নীচের গার্ডদেরও মিষ্টি দেওয়া হলো, দোকানের কর্মচারীদেরকেও প্রচুর মিষ্টি পাঠিয়ে দিলেন আবিদ।
হলুদে আশিকের কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু সস্ত্রীক এলো, রিনিকে দেখে বন্ধুরা মন্তব্য করলো- ব্যাটা আকাশে বিচরণ করলে কি হবে, মাটিতে চোখ রেখে ঠিকই সেরাটাই খুঁজে নিয়েছে।
অবশেষে সব প্রতীক্ষার অবসান হলো, বিয়ে হয়ে গেলো। জুয়েলের তত্বাবধায়নে খুব ভালো ভাবে সব হলো।
আবিদ বিয়ে শেষ হতে ওদের নিয়ে বাসায় এলেন।
এক হাতে মেয়ে, অন্য হাতে জামাইকে বুকের সাথে সাপটে ধরে ঘরে এসে দাঁড়ালেন, দুই চোখে অশ্রু, মুখে হাসি- মীরার ছবিতে লাল গোলাপের মোটা মালা দুলছে, ছবির নীচে ফুলদানিতে রজনীগন্ধ্যা।ফুলের সুগন্ধে ঘর সুবাসিত।
দুর্দান্ত আবিদ চৌধুরী- বদলে যাওয়া আবিদ চৌধুরী সজল কন্ঠে বলেন- দেখো গো, তোমার আদরের রিনি আজ শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছে- তুমি- তুমি দেখতে পাচ্ছো? তুমি- আর কিছু বলতে পারলেন না, কান্নায় ভেঙে পড়লেন।
আশিক ও রিনি একইসঙ্গে দুজন তাঁর দু’ নয়নের অশ্রু মুছিয়ে দেয়- ওদেরও চোখে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। রিনি মনে মনে বলে- মা, তোমার কাছে প্রতীজ্ঞা করেছিলাম, সব পূরণ করেছি, তুমি খুশী হয়েছো মা?- যেখানেই থাকো তুমি, শান্তিতে থাকো মা আর আমাদের দোয়া করো।
সবার চোখে বেদনার অশ্রু- মুখে আনন্দের হাসি- মীরার হাসি মাখা ছবির মুখটি নীরবে চেয়ে রইলো ওদের দিকে।
বাসর রাত- আকাশে চাঁদ তারা, ঘরে কাঁচা ফুলের মৌ মৌ সুবাস, পালঙ্কে ফুল ছড়ানো শয্যায় সালঙ্কারা রূপসী বধূ- বহু প্রতীক্ষিত এই মধুর রাত নারী পুরুষের জীবনের শ্রেষ্ঠ রাত একবারই আসে জীবনে- কৃপণের মত একটু একটু করে উপভোগ করার রাত- আশিক প্রেয়সীর ঘোমটা খুলে ফেলে দুই হাতে অপরূপ মুখটা তুলে ধরে বলতে শুরু করে- রিনি আমার রিনিঝিনি, তুমি কি জানো- তোমাকে কি মারাত্মক সুন্দর লাগছে?
এমন রোমান্টিক মুহূর্তে হাসি আর চাপতে পারলো না রিনি, হেসে উঠলো- আশিক নির্বিকারভাবে বললো- ওগো সুন্দরী বধূ তুমি কি জানো-
কথা শেষ করতে পারলো না সে, মেহেদী রাঙানো হাত তুলে রিনি স্বামীর মুখে আলতো ভাবে চেপে ধরলো।
কাঙালকে শাকের ক্ষেত দেখানো, নিমিষেই আশিক রিনিকে দুই সবল বাহু দিয়ে বুকে টেনে নিয়ে সর্বশক্তিতে চেপে ধরে পিষে ফেলতে লাগলো, সেই সাথে পাগলের মত চুমো খেয়ে ওকে একেবারে বিপর্যস্ত করে ফেললো- এই দস্যিকে আটকানোর সাধ্য রিনির নেই- আকাশের চাঁদ পাগলের কান্ড দেখে মেঘের আড়ালে লজ্জায় মুখ লুকিয়ে ফেললো।
তিন দিন পরে- আশিক, রিনি হানিমুনে যাচ্ছে, লন্ডনে, সেখান থেকে ইটালি যাওয়ার প্ল্যান আছে।
বাংলাদেশ বিমানেই যাচ্ছে, বিমানের বেষ্ট ম্যান আশিক দুটো ফ্রি টিকিট পেয়েছে। সন্ধ্যা সাতটায় ফ্লাইট- ওদের সী অফ করতে এসেছিলো আলো আর জুয়েল- দুজনের বাবার কাছে থেকে বাসাতেই বিদায় নিয়েছে, আলোদের ডিউটি হচ্ছে রিনিরা না ফেরা পযর্ন্ত দুই বুড়োর খেয়াল রাখা।
প্লেনে উঠতেই স্বাগতম জানালো আশিকের পরিচিত ক্রুরা, বিমানবালা মিষ্টি হেসে ওদের সীট দেখিয়ে দিলো, রিনিকে বললো কোনো কিছুর দরকার হলে নিঃসংকোচে বলতে, আশিক ওকে সীটে বসিয়েই প্লেনের ক্যাপ্টেনের সাথে দেখা করতে গেলো ককপিটে।
রিনি ভাবছে-কত দ্রুত সময় চলে যায়, এই সেদিন আশিকের সাথে পরিচয় হলো আর আজ সে তার স্ত্রী- আশিক বেশী ছুটি পায়নি তাই একরকম তাড়াহুড়ো করেই হানিমুনে যেতে হচ্ছে। বিয়ে উপলক্ষ্যে কত আনন্দ করেছে সবাই, প্রতিটা অনুষ্ঠান এত অল্প সময়ে ভালো ভাবেই হয়েছে। আসার সময় বাবার জন্য খারাপ লেগেছে, যে মানুষটা কিছু দিন আগেও ছিলো কত দুরের আর আজ হ্নদয়ের এত কাছে।
আশিক বের হয়ে এলো, রিনির পাশে বসেই বললো- এই এখনি রওনা দেবে।
বলতে না বলতেই সবগুলো ইঞ্জিন একসঙ্গে পূর্ণ শক্তিতে গর্জন করে উঠলো। ব্রেক দেয়া থাকায় কাঁপছে পুরো এয়ারক্র্যাফট।
রিনির সীট বেল্ট ঠিক মত বাঁধা হয়েছে কিনা পরীক্ষা করলো আশিক- রিনি ওর কানের কাছে মুখ এনে বললো- টেক- অফ করার আগে কেন ওরা সবসময় এত আওয়াজ করে, আগেও তো চড়েছি প্লেনে, এই রকমই বিকট শব্দ হয়।
মাথা ঝাঁকালো আশিক, তারপর ইঞ্জিনের শব্দ খানিকটা কমে আসতেই বললো- এটা হোলো ইঞ্জিনের রান- আপ, টেক- অফের আগে সব সময়ই করতে হয়, দুর্ঘটনার আশঙ্কায় সব ইঞ্জিনেই দুটো করে ম্যাগনেটো থাকে, রান- আপের সময় ইঞ্জিনগুলো ফুল থ্রটলে চালু করে ম্যাগ গুলো আলাদা ভাবে পরীক্ষা করা হয়। পাইলট যখন সন্তষ্ট হয় যে ঠিক আছে ওগুলো- একমাত্র তখনই টেক- অফ করে, তার আগে নয়।
-এই চললাম।
ইঞ্জিনের আওয়াজ আরেকটু গভীর হয়ে উঠতেই বললো আশিক- পেছন দিকে তীব্র একটা চাপ অনুভব করলো ওরা, জানালার পাশে বসেছে রিনি , দেখলো রানওয়ের উপর দিয়ে দ্রুত গতিতে ছুটতে শুরু করেছে যন্ত্র দানব, প্রায় সঙ্গে সঙ্গে মৃদু একটা ঝাঁকুনি- শূন্যে উঠে পড়েছে প্লেন।
রিনির সীট বেল্ট খুলে দিয়ে আশিক উঠে দাঁড়াতেই রিনি অবাক হলো- আরে কোথায় যাচ্ছো?
-ক্যাপ্টেনকে জিজ্ঞেস করে আসি সব ঠিক আছে কিনা।
রেগে গেলো রিনি- প্লেন কি তুমি চালাচ্ছো না তোমার ক্যাপ্টেন? তোমার অত জানার দরকার কি, বোসো চুপ করে, যাবার দরকার নেই, নাকি বিমানবালার সাথে কথা বলতে মন চাইছে?
-অতি বড় গাধাও স্ত্রী উপস্থিত থাকলে অন্য মেয়েতে আগ্রহ দেখাবে না, আরে ও তো আমার ডিউটির সময়ই থেকেছে কত, পুরনো হয়ে গেছে।
-এই সবও চলে? আর ভাণ করো রিনি ছাড়া জীবন বৃথা? কথা বলবে না আমার সাথে।
-প্রিয়তমা ভুলে যাচ্ছো যে এটা তোমার বেডরুম নয়, বোয়িং বিমান- আরো মানুষ আছে।
-আমার সাথে কথা বলতে মানা করলাম না?
-রিনি, তুমি কি জানো, রাগ করলে তোমাকে-
-খুব জানি, রাগ করলে আমাকে ভীষণ সুন্দর লাগে।
-জ্বী না, রাগ করলে তোমাকে পেঁচার মত লাগে।
-কি- ই- ই!
কটমট করে তাকালো রিনি স্বামীর দিকে, দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে থাকলো অল্পক্ষণ- তারপর সহসা দুজনেই হাসিতে ফেটে পড়লো।
-আমার এমন পরীর মত বউ থাকতে আর কাউকে লাগে?
রিনির কাঁধে হাত দিয়ে নিজের কাছে একটু টেনে নিয়ে এলো আশিক, রিনি স্বামীর একটা হাত আঁকড়ে ধরে তার কাঁধে মাথা রেখে আবেশে চোখ বন্ধ করলো, আশিকের মত স্বামী পেয়ে ধন্য সেও।
প্লেনে তখন ডিনার দেওয়া শুরু হয়েছে।
আশিক-রিনি নব দম্পতির চোখে আগামী দিনের সুখ স্বপ্ন- রঙিন সোনালী জীবনের প্রতিশ্রুতি- মধুচন্দ্রিমার মুহূর্তকে সার্থক ও পরিপূর্ণ উপভোগ করতে উড়ে চললো সূদুর নীল আকাশ পাড়ি দিয়ে দূরে আরো দূরে- যেখানে শুধুই দুজনে বিজনে একান্তে পরস্পরের হয়ে মধুর সময়গুলো স্বরণীয় হয়ে থাকবে।
সমাপ্ত